
একটি উৎসব আয়োজন যে মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হতে পারে, তা আবারও প্রমাণ মিললো বাগেরহাটের সড়ক দুর্ঘটনায়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নৌ-বাহিনীর বাসের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে চার জনই শিশু। যাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরের নিচে। মারা গেছেন তাদের মায়েরাও। গাড়িতে শিশু সন্তানদের শান্ত রাখতে মা হয়তো তাদের চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। বিয়ে উপলক্ষে বর ও কনের পরিবারের স্বজনেরা হয়তো কিনেছিলেন নতুন জুতো। কিন্তু এখন মা-সন্তান কিংবা বিয়ের আনন্দে মেতে থাকা যাত্রীরা কেউই আর নেই এই পৃথিবীতে।
তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। আর দুর্ঘটনাস্থল সড়কের ঢালজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য কাচের টুকরা। গাড়ির ভাঙা নানা অংশের সঙ্গে পড়ে আছে কয়েক জোড়া জুতা-স্যান্ডেল। এর মাঝেই নজরে পড়ে একটি শিশুর চুষনি। শুক্রবার সকালে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকার খুলনা-মোংলা মহাসড়কে দেখা যায় এ দৃশ্য। এখানেই বর-কনেবাহী মাইক্রোবাসটিতে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বিয়ের আনন্দযাত্রা মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকে।
দুর্ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক লোকজন এখনও ভিড় করছেন ঘটনাস্থলে। আশেপাশে পুরো এলাকায় শোক ও হতবিহ্বল পরিবেশ। যারা দেখছে এসেছেন, তাদের কারো কারো চোখে অশ্রু আর মুখে স্তব্ধতা।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহলা বুনিয়া এলাকার বাসিন্দা ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের সঙ্গে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের মার্জিয়া আক্তার মিতুর বিয়ে হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নববধূ মিতুকে নিয়ে মোংলায় বাড়ি ফিরছিলেন বরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌ-বাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় বর ও কনে এবং মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের প্রাণ যায়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে রাজ্জাকের বাড়ির গন্তব্য ছিল মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় মোংলার এই বর ও কনের আর বাড়ি ফেরা হয়নি।
বরের পক্ষের নিহতরা হলেন- বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তার ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাদের ছেলে আলিফ, আরফা ও ইরাম। শুক্রবার ভোরে তাদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। আর কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়।
তারা হলেন- কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম। নিহতদের মধ্যে আরেকজন হলেন মাইক্রোবাস চালক নাইম। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। আজ তারা সবাই এক একটা বিষাদের নাম।
মন্তব্য করুন