
যশোরাঞ্চলের অধিকাংশ পাম্পে মিলছে না জ্বালানি তেল। যশোর শহরে প্রতিদিন হাতেগোনা কয়েকটি পাম্প থেকে তেল সরবরাহ করা হলেও লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে। তেল সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরিবর্তে আরো তীব্র হচ্ছে। খোলা থাকা পাম্পগুলোতে লাইনে দাঁড়িয়ে কেটে যাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রতিদিন এ যেনো এক যুদ্ধ। আর চলছে সেই যুদ্ধ জয়ের প্রতিযোগিতা।
- তেল সংগ্রহ এ যেনো যুদ্ধ জয়ের প্রতিযোগিতা
- লাইনে দাঁড়িয়ে কেটে যাচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা
- দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যহত
- খুলনার ডিপোতে চাহিদা দিয়েও মিলছে না
ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিনই দুর্বিসহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে পাম্প কর্তৃপক্ষ ও যান চালকদের। দু’একটি পাম্পে এক বেলা তেল থাকছে, আবার অন্য বেলায় নেই। তেল থাকলে লম্বা লাইন আর হট্টগোল চলছে। আর তেল না থাকলে এক শ্মশানসম পরিবেশ বিরাজ করছে পাম্প অঙ্গনে। তেল না পেয়ে যানবাহন চলাচল ব্যহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। অনেক যানবাহন পথেই আটকে পড়ছে এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। বৈধভাবে নিজের গাড়িতে তেল সংগ্রহ করতে কারো কারো দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে। আবার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে সংগ্রহের অনৈতিকতার কারণে কৃত্রিম সংকট বাড়ছে। আবার খুলনার ডিপোতে চাহিদা দিয়েও প্রয়োজনমতো তেল মিলছে না বলে অভিযোগ করছেন পাম্প কর্তৃপক্ষ।
গতকাল যশোরের অনেক পাম্পে তেল আসেনি। ফলে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার মত পাম্প কর্মচারী কর্র্তৃপক্ষ সটকে পড়ের জনরোষ এড়াতে। যশোরের বাহন সংশ্লিষ্ট মানুষ ও বাইকারদের জ্বালানি সংগ্রহ করতে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটতে দেখা গেছে।
৬ এপ্রিল সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেল সংগ্রহের জন্য মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কোনো পাম্পে ডিজেল নেই। আবার কোনো পাম্পে ডিজেল আছে তো পেট্রোল নেই, পেট্রোল আছে তো অকটেন নেই। আবার কোনো পাম্পে অকটেন থাকলেও বলা হচ্ছে নেই। গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের অভিযোগ, তাদের চাহিদামত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। এমনকি চলমান প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত পরিমাণও পাচ্ছেন না তারা। যদিও যশোরের পাম্প কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা খুলনার ডিপোতে চাহিদা দিয়েও নির্ধারিত তেল পাচ্ছেন না। বিগত সময়ের চেয়ে অনেক কম সরবরাহ করা হচ্ছে। যে কারণে পাম্পে ‘তেল নেই’ বলে সাইনর্বোড ঝুলিয়ে দিতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল সংকট এখন যশোরাঞ্চলে তুঙ্গে। তেল না পেয়ে গতকাল দিনভর ফিরে যেতে দেখা গেছে অনেক ট্রাক, বাস, মাইক্রো, প্রাইভেট, মোটরসাইকেলসহ নানা ভার্সনের তেল চালিত বাহন চালকদের।
এদিন যশোর শহরের গড়িখানার তোফাজ্জেল ফিলিং স্টেশন, আর এন রোডের যাত্রীক ফিলিং স্টেশন, চয়নিকা ফিলিং স্টেশনসহ উপজেলা পর্যায়ের আরো ডজনখানেক পাম্পে তেল পাওয়া যায়নি। প্রতিটি পাম্পে নোটিশ টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে ‘ডিজেল নেই’ ‘পেট্রোল নেই’ ‘অকটেন নেই’।
সকাল ৮টার দিকে যশোর শহরের মণিহার সংলগ্ন ‘যাত্রীক পেট্রোলিয়াম সার্ভিসের সামনে দেখা মেলে ভ্যানের ওপরে একটি মোটরসাইকেল বাঁধা। মোটরসাইকেলের পাশেই বসে আছেন এক নারী। চালক মণিরামপুর থেকে আসা সাঈদ নামের এক ব্যক্তির মোটরসাইকেল ওটি। জানালেন তার মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে গাড়িতে যে তেল ছিল তা শেষ। কয়েকটা পাম্পে গিয়েও তেল পাননি। অগত্যা মোটরসাইকেল ভ্যানে বেঁধে মাকে নিয়ে এ পাম্প থেকে ও পাম্প ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত যাত্রীক পাম্প থেকেও তেল পাননি বলেও জানান। গতকাল যশোর শহরের মেসার্স মনিরউদ্দিন আহম্মেদ ফিলিং স্টেশনে ও সোনালী ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ করা হয়েছে। তবে যশোরের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। ট্রাক বাস মাইক্রো প্রাইভেট মোটরসাইকেলের অনেকগুলো সারি। মণিরউদ্দিন পাম্পে ৪ সারির যে দীর্ধ লাইন লম্বা চোখে পড়ে তা যোগ করলে এক কিলোমিটারের বেশি লম্বা হয়ে যাবে। কেউ এক ঘন্টা, কেই দু’ঘন্টা পর্যন্ত, আবার কেউ তেল আসার আগে থেকে আগাম লাইনে গতকাল সময় ব্যয় করেছেন ৪ ঘন্টার বেশি সময়। ভিড় ও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হিমসিম খাচ্ছেন পাম্প কর্তৃপক্ষ।
তেল সরবরাহের সময় পাম্পে একজন ট্যাগ অফিসার ও একজন পুলিশ সদস্য থাকছেন, যিনি রীতিমত বিব্রত হচ্ছেন প্রতি মুহূর্তে। ভিড়ের কারণে অনেকেই অধৈর্য্য হয়ে লাইন ছেড়ে ফিরে গেছেন এমন চিত্র গতকাল চোখে পড়েছে অহরহ। সোনালী ফিলিং স্টেশনেও একই অবস্থা ছিল।
পিকআপ চালক যশোরের শেখহাটির আব্দুর রহিম মিয়া জানান, তিনি লোকাল রুট গুলোতে ভাড়া খাটেন। তার দিনে ১০ লিটার ডিজেল লাগে। তিনি সকালে কয়েকটি পাম্পে গেলেও পাননি। শেষমেষ মণিরউদ্দীন পাম্পে তেল আছে সিগনাল পাই। তবে যে লাইন তাতে বিকেল গড়িয়ে যাবে, তাই ফিরে যাচ্ছেন বলে জানান। একইভাবে আরো অনেক বাস ট্রাক ও পিকআপ চালক ও মোটরসাইকেল চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিস্থিতি উত্তরণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, তেল সংকটের কারণে যশোরের অধিকাংশ সাংবাদিক চলমান সংবাদ সংগ্রহে সংকটে পড়েছেন। তাদের দাবি, লম্বা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহে দিনের অর্ধেক সময় চলে গেলে সংবাদ সংগ্রহে যেতে পারছেন না।
এদিকে, চলমান সংকট ও চালকদের দুর্বিসহ পরিস্থিতিতে পড়ার ব্যাপারে মেসার্স মনিরউদ্দীন আহম্মেদ ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, এমনিতেই তাদের পাম্পে সবসময় ক্রেতাদের ভিড় থাকে। কিন্তু গত প্রায় এক মাস পাম্পে এই তেল থাকে তো এই থাকে না। আর তাই তেল নেই সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে হয়। তারা খুলনার যমুনা ডিপো থেকে তেল আনেন। কিন্তু সেখান থেকে চাহিদামত তেল দেয়া হচ্ছে না এক মাসব্যাপী। গতকাল সেখানে চাহিদা দিয়ে পাঠানো হলেও কাঙ্খিত তেল আসেনি। যা এসেছিল তা সবই সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এই পাম্পে অকটেন প্রেট্রোল মিলিয়ে ৪৫শ’ লিটার চলত। এখন ডিপোতে ৩ হাজার লিটার চাহিদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাত্র ২ হাজার লিটার পাঠানো হচ্ছে বলে তাকে জানানো হয়েছে। ডিজেল আগে দৈনিক ১৮ হাজার লিটার আনা হত। এখন তা কমিয়ে ৯ হাজার লিটারের চাহিদা দেয়া হলেও সময়মত পৌঁছায়না।
যাত্রিক পাম্প কর্তৃপক্ষের পক্ষে স্টাফরা সাফ জানান, চলমান সংকটে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী যে পরিমাণ সরবরাহ করার কথা তা সরবরাহ করছে না ডিপো থেকে। তারা খুলনার পদ্ম্ াডিপো থেকে ৩০ হাজার লিটার ডিজেলের চাহিদা দিলে দেয়া হচ্ছে মাত্র ৬ হাজার লিটার। ৪ হাজার লিটার পেট্রোলের চাহিদা দিলে দেয়া হয় ২ হাজার লিটার। দিন ১১ হাজার চাহিদা দেয়া হলে আসে ৩ হাজার লিটার। তাহলে চাহিদা মিটবে কিভাবে?
এ ব্যাপারে যশোর জেলা জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন জানিয়েছেন, ইরান ইসরাইল যুদ্ধের কারণে দেশে সাময়িক তেল সংকট দেখা দিয়েছে সত্য। মানুষের ভোগান্তিও হচ্ছে। পাম্প থেকে যেনো কোনো কারসাজি না হয় সে জন্য পাম্পে ট্যাগ অফিসার দিয়ে তদারকি করা হচ্ছে। ডিপো থোকে আনা তেল ঠিকতম বিতরণ হচ্ছে কিনা তা কঠোরভাবে দেখা হচ্ছে। তবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বা ভয়ের কারণে অনেকে মজুত করছেন। অনেকক্ষেত্রে সংকটও তৈরি হচ্ছে। দ্রুতই সংকট কেটে যাবে। তেলের বিশাল বিশাল কয়েকটি চালান এসেছে, আবার পথেও রয়েছে। দ্রুত তেল সমস্যার সমাধান ঘটবে।
মন্তব্য করুন