
সরকার ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১৭শ’ ২৮ টাকা। কিন্তু বাজারে এই দামে কোনো গ্যাস বিক্রি হচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন কোম্পানির গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন ১৯শ’ থেকে ২১শ’ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, তারা বাড়তি দামে কিনছেন, তাই বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ভোক্তা সাধারণের বক্তব্য, পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের বাড়তি খরচে যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা, ঠিক তখনই নতুন করে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। সরকার এপ্রিল মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। কিন্তু সরকারি এই মূল্য নির্ধারণ কাগজেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে যশোর শহরের বাজারে চলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। খোলাখুলিভাবে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি গ্যাস। প্রকারভেদে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়। কোথাও সরকারি দামের কোনো প্রতিফলন নেই। বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নিচ্ছেন, আর ভোক্তারা বাধ্য হয়ে সেই বাড়তি মূল্য দিয়েই গ্যাস কিনছেন। শনিবার শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এ চিত্র উঠে এসেছে।
শহরের ষষ্ঠীতলা এলাকার মনিরুল ইসলাম ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, সরকার দাম বাড়িয়েছে তা কষ্ট করে মেনে নিচ্ছি। কিন্তু সেই দামের ওপর আবার ৩০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে কেন? তাহলে সরকারের নির্ধারিত দাম কি শুধুই দেখানোর জন্য? একই সুর শোনা গেছে জেলরোডের আশরাফ, কবিতা বেগম, রেলস্টেশন এলাকার টগর বিশ্বাস ও লোন অফিস পাড়ার পল্লবের কণ্ঠে। তাদের ভাষায়, এটা কোনো বাজারব্যবস্থা নয়, এটা সরাসরি ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে গরীব শাহ রোডের মামুন এন্টারপ্রাইজ, কাদের এন্টারপ্রাইজসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, বসুন্ধরা ও বেক্সিমকো ব্র্যান্ডের গ্যাস ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে যমুনা, সান, সেনা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম, টোটাল, জিএস, ফ্রেশ, ওমেরা প্রভৃতি দ্বিতীয় শ্রেণির গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা অবশ্য দায় এড়িয়ে দোষ চাপাচ্ছেন ডিলারদের ওপর। কাদের এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার ইকরামুল ইসলাম বলেন, আমরাই বেশি দামে কিনছি। বেক্সিমকো ও বসুন্ধরার গ্যাস কিনতে হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকায়। কম দামে বিক্রি করলে তো লোকসান হবে। একই যুক্তি দেন মামুন এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার জসিম হোসেন। তার কথায়, কেনা দামের চেয়ে কমে বিক্রি করা সম্ভব না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর শহরে এলপিজি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ডিলার দুটি। তার একটি পালবাড়ির সোনালী এন্টারপ্রাইজ এবং নিউমার্কেটের ফিরোজ এন্টারপ্রাইজ। অধিকাংশ খুচরা ক্রেতা জানান তাদের কাছথেকেই গ্যাস কিনে বিক্রি করছেন।
সোনালী এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা যায়, পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ থাকলেও দাম বেশি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফসিয়ার রহমান দাবি করেন, সরকার ১২ কেজি গ্যাসের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। অথচ তাদেরই ওই দামে কিনতে হচ্ছে। যা আগেই ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করতে হয়। ফলে তাদের হাতেও তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বাধ্য হয়ে বেশী দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এদিকে, বাজারে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে কিনে থাকেন, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও বড় ধরনের অনিয়ম বা সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রæত বাজার তদারকি, ডিলার পর্যায়ে তদন্ত এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে এলপিজি বাজার পুরোপুরি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
মন্তব্য করুন