মঙ্গলবার
২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

গ্রাম আদালতে শান্তির সুবাতাস

মিলন রহমান
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১২:২০ পিএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০১:১৫ পিএম
গ্রাম আদালতে শান্তির সুবাতাস

পাওনা ৪০ হাজার টাকার জন্য কোর্ট-কাচারিতে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরুপপুর গ্রামের আলম খানের। এখন গ্রাম আদালতের মাধ্যমে পাওনা আদায় করে তিনি নতুন করে ব্যবসার পরিকল্পনা করছেন।

আলম খান বলেন, ‘ওই টাকা দিয়ে আবার ব্যবসা করতি পারবো। এ্যাতো জুলদি যে আমার মত গরীব মানসির বিচার পাবো তা ভাবতেই পারিনি। মামলার ফিস ২০ টাকা, যাতায়াত ৮০ টাকা-মোট ১০০ টাকা খরচে বিচার পাইছি।’

  • জেলায় গ্রাম আদালতে গড়ে একটি মামলা নিস্পত্তি হতে ১০ দিন সময় লাগছে : প্রকল্প কর্মকর্তা মহিতোষ কুমার রায়
  • গ্রাম আদালত সঠিকভাবে পরিচালিত হলে অনেক বিরোধ স্থানীয় পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে : ডিডিএলজি রফিকুল হাসান

শুধু আলম খান নন, এমন অভিজ্ঞতা এখন যশোরের অনেক মানুষের। স্বল্প ব্যয়ে, কম সময়ে এবং নিজ এলাকার ভেতরেই বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে আস্থার জায়গা হয়ে উঠছে গ্রাম আদালত।

ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের রাবেয়া বেগমের অভিজ্ঞতাও একই রকম। প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সঙ্গে মারামারির ঘটনায় তিনি আদালতে গেলেও বিষয়টি গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় তাকে সেখানেই পাঠানো হয়। পরে দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে তিনি ক্ষতিপূরণ পান।

রাবেয়া বেগম বলেন, ‘খাওয়া, যাতায়াত সব মিলিয়ে আমার ৬১০ টাকা খরচ হয়েছে। আগে জানতামই না গ্রাম আদালতে বিচার হয়। এতো অল্প খরচে বিচার পাবো ভাবতেই পারিনি।’

যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ী ইউনিয়নের ক্ষুদ্র ভুষিমাল ব্যবসায়ী জাহিদুর রহমান শিমুল জানান, ব্যবসায়িক লেনদেনে আটকে থাকা লাখ টাকা ফেরত পেতে দীর্ঘদিন স্থানীয় সালিশে ঘুরেও সমাধান পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত গ্রাম আদালতে আবেদন করে অল্প সময় ও স্বল্প খরচে পাওনা বুঝে পেয়েছেন। অভিযোগ করা থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত মাত্র ১৮০ টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যান ভাড়া আর নাস্তাও খরচ রয়েছে।

শিমুল বলেন, গ্রাম আদালত না থাকলে এ টাকার জন্য উচ্চ আদালতে যেতে হতো। সেখানে বছরের পর বছর সময় লাগার পাশাপাশি আইনজীবী ও আনুষঙ্গিক খরচেই কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যেত। গ্রাম আদালত তাকে শুধু টাকা ফেরতই দেয়নি, বাঁচিয়েছে দীর্ঘ ভোগান্তিও। আর যশোরের শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের সামসুর রহমান গ্রাম আদালতের মাধ্যমে মাত্র ২৪ দিনে তার বেদখলকৃত ১ শতক জমি গ্রাম আদালতের মাধ্যমে ফেরত পেয়েছেন।

গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের কর্মকর্তা মহিতোষ কুমার রায় জানান, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত যশোর জেলার ৮টি উপজেলার ৯৩টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের হয় ৬ হাজার ৭১৮টি। এর মধ্যে সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে দায়ের হয় ৫ হাজার ৯৪৮টি। এছাড়া জেলা আদালত থেকে পাঠানো হয় ৬৪৬টি এবং পূর্বের অপেক্ষমান মামলা ছিল ১২৪টি। এর মধ্যে দেওয়ানি ৩ হাজার ৫৭৮টি ও ফৌজদারি ৩ হাজার ১৪০টি। দায়েরকৃত মামলার মধ্যে আবেদনকারী পুরুষ ৪ হাজার ৩৫৫ (৬৪.৮৩%) এবং নারী ২ হাজার ৩৬৩ (৩৫.১৭%) জন। নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৬ হাজার ৬২২টি (৯৮.৫৭%)। নিষ্পত্তিকৃত মামলার মধ্যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৬ হাজার ১১৪ টি এবং মোট ক্ষতিপূরণ আদায় ১১ কোটি ৮১ লাখ ২৭ হাজার ৮৪০ টাকা। যা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে দেওয়া হয়েছে। জেলায় গ্রাম আদালতে গড়ে একটি মামলা নিস্পত্তি হতে ১০ দিন সময় লাগছে।

গ্রাম আদালতের এ সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, প্রশাসনিক কর্মকতা, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ। এ উদ্যোগকে আরও গতিশীল করতে যশোর জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন দাতা সংস্থা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘বাংলাদেশে গ্রাম সক্রিয়করণ তৃতীয় পর্যায় প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে সেবা প্রদানকারীদের সক্ষমতা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিচার প্রার্থীদের মধ্যে গ্রাম আদালত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে জেলা, উপজেলা ও ইউনিযন পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে গ্রামের মানুষ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ন্যায়বিচার পেতে শুরু করেছেন।

মহিতোষ কুমার রায় আরও জানান, গ্রাম আদালতে মূলত দেওয়ানি মামলার সাতটি বিষয়ে বিচার করা হয়ে থাকে। এগুলো হলো, পাওনা টাকা আদায়, জমি দখল, অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধার, অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ, কৃষি শ্রমিকের পরিশুদ্ধ মজুরি আদায়, খোরপোষ এবং গবাদি পশুর অনধিকার প্রবেশে ফসলের ক্ষতি। এর মধ্যে বেশি মামলা আসে পাওনা টাকা আদায়, জমি উদ্ধার, খোরপোষ এবং অস্থাবর সম্পত্তি বিষয়ক।

অন্যদিকে, ফৌজদারি মামলার দন্ডবিধির ২৭টি ধারার মামলার বিচারের এখতিয়ার রয়েছে এই আদালতের। এর মধ্যে অন্যতম চুরি, আত্মসাত, যাতায়াতে বাধা, ছোট ছোট ঝগড়া বিবাদ মারামারি, প্রতারণা, হুমকি, নারীদের শ্লীলতাহানি, গবাদি পশুহত্যা বা অঙ্গহানি ইত্যাদি। এর মধ্যে মারামারি, চুরি, প্রতারণা, যাতায়াতে অবৈধ বাধা প্রদান ও গবাদি পশু বিষয়ক মামলা বেশি আসে।

গ্রাম আদালতের কার্যক্রম প্রসঙ্গে যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, তিনি সপ্তাহে দু’দিন গ্রাম আদালত পরিচালনা করেন। প্রতি আদালতে গড়ে ৪/৫টি মামলার নিস্পত্তি করা হয়। প্রথম শুনানি থেকে শুরু করে ১৫ দিনের মধ্যেই মামলার নিস্পত্তি করে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘোরার ভোগান্তি দূর হয়, তেমনি আদালতেরও কিছু বাড়তি মামলার চাপ কমে।

তবে এক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতার বিষয়ও তুলে ধরেন চেয়ারম্যান মো. তৈয়বুর রহমান। তিনি জানান, অনেক সময় গ্রাম আদালতে মামলার বিচার করতে গেলে রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করতে হয়। আবার নোটিস করলে অনেকে গ্রাম আদালতে আসতে চান না। সেক্ষেত্রে সবসময় প্রশাসনের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। আর কেউ যদি গ্রাম আদালতে না এসে পার পেয়ে যায়, তখন সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। পাশাপাশি ন্যায়বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতের বিচারক চেয়ারম্যানের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

যশোর আইনজীবী সমিতির সাবেক সহকারী সম্পাদক ও প্রাক্তন এপিপি অ্যাড. তাহমিদ আকাশ বলেন, গ্রাম আদালত সরকারের খুবই সুন্দর ও কার্যকর একটি উদ্যোগ। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত অনেক মামলা আদালত থেকে গ্রাম আদালতেও প্রেরণ করা হয়ে থাকে। ছোট ছোট বিরোধ সমস্যাগুলো যদি গ্রাম আদালতে নিস্পত্তি হয়ে যায়, তাহলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি যেমন কমে, তেমনি আদালতেও মামলার চাপ কমে। আবার বিচারক যেহেতু চেয়ারম্যান, ফলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সবপক্ষকে চেনেন, ফলে কার্যকর বিচার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

তবে গ্রাম আদালত নিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেক ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যান নেই। সেক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। সেখানে বিকল্প উপায় বা বিকল্প বিরোধ নিস্পত্তি প্রয়োজন। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদে থাকলেও পৌর এলাকায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম নেই। আদালত থেকে বলা হলে বা আইনে থাকলেও পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো নির্দেশনা না থাকায় এখানে গ্রাম আদালত চালু নেই। এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

যশোর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল হাসান বলেন, গ্রাম আদালতের বিচারিক সেবা ইউনিয়ন পরিষদের একটি আবশ্যকীয় কাজ। এখানে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন চেয়ারম্যান, মেম্বাররা। গ্রাম আদালত সঠিকভাবে পরিচালিত হলে অনেক বিরোধ স্থানীয় পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন, অন্যদিকে উচ্চ আদালতগুলোর ওপর মামলার চাপও কমবে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া দল ঘোষণা

তিতুমীর কলেজে হল ফি কমানোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

যশোরসহ ১০ জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মেডিয়েশন কার্যক্রমের উদ্বোধন

বিশ্ববাজারে কমেছে তেলের দাম

কালীগঞ্জে অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল ধ্বংস, দুই রেস্টুরেন্টকে জরিমানা

আজ সোনার ভরি কত?

ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

সংসদ অভিমুখে ফের পদযাত্রা করবে সিজেপি, উত্তপ্ত দিল্লির যন্তর মন্তর

টিভিতে আজকের খেলার সূচি

২১ জুলাই: ইতিহাসের এই দিনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে: মির্জা ফখরুল

হাম ও ডেঙ্গু দু’টোই প্রতিরোধ জরুরি

গোপালগঞ্জে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বৃদ্ধ আটক

ভারি বৃষ্টিতে সাজিয়ালীর ব্রিজ ভেঙে জনদুর্ভোগ চরমে, বিকল্প পথে চলছে যাতায়াত

নড়াইলে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা

বাঘারপাড়ায় ট্রাকচাপায় সাইকেল আরোহীর মৃত্যু

যশোর জেলা স্যানিটারি ও নলকূপ ব্যবসায়ী সমিতি   / নির্বাচন ঘিরে উৎসব আমেজ পাইপপট্টিতে১৩ পদের জন্য লড়াইয়ে ২৫ প্রার্থী

কিশমিশ খেলে মিলবে ৭ উপকারিতা

গোস্ত কিনতিও হ্যারেজ খাতি হয় 

চিকিৎসা যাবে সবার দুয়ারে: প্রধানমন্ত্রীর নতুন নির্দেশনা

X