
রাজশাহী অঞ্চলের ওপর দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের জনজীবন। বিশেষ করে খেটে খাওয়া ও কর্মজীবী মানুষের কষ্ট বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এই তাপদাহে মানুষ, প্রাণী, ফসল ও প্রকৃতি সবকিছুই যেন এক নির্মম দহনে ক্লান্ত। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে প্রকৃত চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি মনে হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর আগের দিন বুধবার (৩ জুন) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে মঙ্গলবার (২ জুন) ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সোমবার (১ জুন) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রবিবার (৩১ মে) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে সেটিকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়।
রাজশাহীতে তীব্র গরমের প্রধান কারণ হলো মৌসুমি বায়ুর দেরিতে প্রবেশ এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়নে কংক্রিটের আধিক্য ও গাছপালা কমে যাওয়া এবং দিনের ব্যাপ্তি দীর্ঘ হওয়ায় ভূপৃষ্ঠ অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে পড়ে।
এছাড়া বিলম্বিত মৌসুমি বায়ু ও পশ্চিমা লঘুচাপও কারণ। সাধারণত জুন মাসের শুরুতেই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত বাড়ে এবং তাপমাত্রা কমে। তবে এর আগমন বিলম্বিত হওয়ায় মেঘমুক্ত আকাশে সূর্যের আলো সরাসরি ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করছে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গরমের তীব্রতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেশি। একই সঙ্গে বাতাসের গতি কম থাকায় গরম বাতাস স্থির হয়ে থাকে। এর ফলে শরীর থেকে ঘাম দ্রুত শুকায় না এবং প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হয়।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং গাছপালা ও জলাশয় কমে যাওয়ার কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রাজশাহী বেশি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালে দিনের বেলা বড় হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের তাপ ভূ-পৃষ্ঠে পড়ে এবং পরিবেশে তাপ জমে থাকে।
নগরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পিচগলা রাস্তায় একটু স্বস্তির খোঁজে পথচারীরা ভিড় করছেন আখের রসের দোকানে। চোখের সামনে কল থেকে পিষে বের করা শীতল এক গøাস আখের রস জুড়িয়ে নিচ্ছেন প্রাণ। তীব্র গরমে তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ মানুষ ডাবও খাচ্ছেন। তবে চাহিদার সুযোগ নিয়ে বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেও রাতের রাজশাহীতে স্বস্তির কোনও লক্ষণ নেই।
আবহাওয়ার সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, রাতের আকাশ প্রধানত পরিষ্কার থাকলেও ভ্যাপসা গরম কাটছে না। রাতে তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে শরীরে তা প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অনুভূত হচ্ছে। মধ্যরাতের দিকে তাপমাত্রা সামান্য কমে ২৯ থেকে ২৮ ডিগ্রিতে নামলেও আর্দ্রতা প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে, যা গরমের অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নগরীর মথুর ডাঙ্গা এলাকার রিকশাচালক সেন্টু মিয়া বলেন, রাস্তার পিচ থেকে মনে হয় আগুনের ভাপ উঠছে, রিকশার সিটে বসা যায় না। একটু পর পর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, কিন্তু পেটের দায়ে এই জানমারা গরমেও রিকশা নিয়ে বের হতে হয়।
ট্রাফিক কনস্টেবল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মাথার ওপর চড়া রোদ আর চারপাশের গাড়ির গরম ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় দম আটকে আসে। ডিউটি তো করতেই হবে, তাই পকেটে স্যালাইনের পানি রেখে একটু পর পর খেয়ে শরীরটা কোনোমতে টিকিয়ে রাখছি।
মন্তব্য করুন
৩০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম