
গাইবান্ধা জেলার নিভৃত গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী আব্দুর লতিফ সরকার এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি একজন সরকারি ভূমি অফিসের কর্মচারী। জীবদ্দশাতেই তিনি নিজের কবর নির্মাণ করে সেটির নিয়মিত পরিচর্যা করে যাচ্ছেন।
তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে যেমন বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, তেমনি অনেকের কাছে এটি ধর্মীয় অনুপ্রেরণারও বিষয় হয়ে উঠেছে।
আব্দুর লতিফ সরকারের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার সাহাপাড়া ইউনিয়নের খামার পীরগাছা গ্রামে। বর্তমানে তিনি খোলাহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত আছেন।
তিনি ১৯৮৫ সালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি শুরু করেন এবং ১৯৮৯ সালে তার চাকরি স্থায়ী হয়।
প্রায় ২০০৭ সাল থেকেই নিজের কবর নিজ হাতে তৈরির চিন্তা তার মাথায় আসে। দীর্ঘ পরিকল্পনার পর ২০১১ সালে বাড়ির সামনে একটি ছোট পুকুর ভরাট করে তিনি নির্মাণ কাজ শুরু করেন।
কবরের আকার, নকশা ও পরিমাপ নিজেই নির্ধারণ করেন। পরে নিজ হাতে কবর খনন করে ধাপে ধাপে রাজমিস্ত্রীর সহায়তায় ইটের কাজ, পিলার ও গম্বুজ আকৃতির কাঠামো নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে বসিয়েছেন টাইলসও। হাতে অতিরিক্ত অর্থ এলেই ব্যয় করেছেন কবরের সৌন্দর্য বাড়াতে।
শুধু কবর নির্মাণেই থেমে থাকেননি তিনি। মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতিও আগে-ভাগেই সম্পন্ন করেছেন। ২০১৩ সালে গ্রামের মানুষদের দাওয়াত দিয়ে নিজের “চল্লিশা” পর্যন্ত আয়োজন করেন। দাফনের কাপড় কিনে নিজ হাতে কেটে প্রস্তুত করে রেখেছেন। এমনকি মৃত্যুর পর গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় সাবান, গোলাপজলসহ বিভিন্ন সামগ্রীও সংগ্রহ করে রেখেছেন।
প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় শেষে প্রথমেই নিজের কবর দেখতে যান আব্দুল লতিফ। কোথাও ময়লা বা অগোছালো কিছু চোখে পড়লে নিজেই পরিষ্কার করেন। পরিবারের সদস্যদেরও বলে রেখেছেন, মৃত্যুর পর তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয় এবং কবরের পরিচ্ছন্নতা নিয়মিত বজায় রাখা হয়।
স্বজনরা জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই নিজের কবর নিজ হাতে তৈরি করার ইচ্ছা ছিল তার। সেই লক্ষ্যেই এক যুগ আগে শুরু করেন, তবে তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে মৃত্যুর পর তাকে ওই কবরেই দাফনের প্রস্তুতি নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
আব্দুর লতিফ সরকারের নাতি আবু হানিফ শেখ বলেন, দাদি মারা যাওয়ার পর আমিসহ আমার পরিবারের ভাইয়েরা মিলে তার গোসলসহ খাটলি ধরার সব কাজ আমরাই করব। এই কথা আমি আগেই দাদাকে বলে রেখেছি। এলাকাবাসীর চোখে বিষয়টি যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি ইতিবাচকও। রাস্তার পাশেই নির্মিত হওয়ায় প্রতিদিনই কৌতূহলী মানুষ ভিড় করছেন কবরটি দেখতে।
আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, আমার বিশ্বাস, সারা জীবনের ইবাদতের মধ্যে কোনো একটি ইবাদত কবুল হওয়ার কারণেই আল্লাহ তাকে নিজের কবর নিজ হাতে নির্মাণ করার সুযোগ দিয়েছেন। এ থেকেই তিনি একাজটি সম্পূর্ণ করেছেন। সবার কাছে দোয়া চান তিনি।
সাহাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান সরকার বলেন, আব্দুর লতিফ ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তিনি অধিকাংশ সময় ইবাদত-বন্দেগিতে কাটান। তার এই উদ্যোগকে অনেকে পরকালীন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
গাইবান্ধার এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং জীবনের অনিশ্চয়তা ও পরকালীন প্রস্তুতি নিয়ে গভীর এক চিন্তার প্রতিফলন। আব্দুর লতিফ সরকারের জীবদ্দশায় নিজের কবর নির্মাণ ও নিয়মিত পরিচর্যা এখন স্থানীয়ভাবে একটি ব্যতিক্রমী ও আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন