
২০১৩ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ অঞ্চলে উন্নয়নের গতি আরও বাড়ে। ২০১৬ সালে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হলে বিদেশি প্রকৌশলী ও কর্মীদের আগমন বাড়তে থাকে। তাদের আবাসনের জন্য নতুনহাট এলাকায় নির্মিত হয় একাধিক বহুতল ভবন, যা বর্তমানে জেলার অন্যতম বৃহৎ আবাসন কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত।
সন্ধ্যা নামলেই যেখানে চারদিকে নেমে আসত নিস্তব্ধতা, শোনা যেত শিয়ালের ডাক সেই পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর-নতুনহাট এলাকা এখন যেন মিনি রাশিয়া। ঝলমলে আলোকসজ্জা, বহুতল ভবন, বিদেশি নাগরিকদের চলাচল আর ব্যস্ত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে বদলে গেছে পুরো এলাকার চিত্র। স্থানীয়দের অনেকেই এখন এলাকাটিকে ডাকছেন ‘মিনি রাশিয়া’ নামে। পাবনার ঈশ্বরদী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পকে ঘিরেই মূলত এ পরিবর্তনের সূচনা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে বর্তমানে সেখানে কর্মরত রয়েছেন কয়েক হাজার রুশ নাগরিক। তাদের বসবাস, যাতায়াত ও দৈনন্দিন চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আবাসন, রেস্টুরেন্ট, বিপণিবিতান, হাসপাতাল ও বিনোদনকেন্দ্র। একসময়কার নিরিবিলি গ্রাম এখন পরিণত হয়েছে ব্যস্ত শহুরে জনপদে। ঐতিহাসিকভাবেও রূপপুর ও পাকশী অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ আমলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ এবং পাকশী রেলওয়ে জংশনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে প্রথম উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় রূপপুর এলাকায় যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়তে থাকে। প্রকল্প ঘিরে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে ব্যাপকভাবে। স্থানীয়দের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বদলে গেছে নতুনহাট, সাহাপুর, দিয়াড় বাঘইলসহ আশপাশের গ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র।
গতকাল বিকালে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রুশ নাগরিকরা স্থানীয় বাজার, শপিংমল ও রেস্টুরেন্টে স্বাভাবিকভাবেই সময় কাটাচ্ছেন। অনেক দোকান ও মার্কেটের সাইনবোর্ডে বাংলার পাশাপাশি রুশ ভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ধীরে ধীরে রুশ ভাষায় যোগাযোগে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। নতুনহাট এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী দৈনিক গ্রামের কাগজকে জানান, প্রথমদিকে ভাষা বুঝতে কষ্ট হতো।
এখন অনেক রুশ নাগরিক বাংলা বুঝতে পারেন, আমরাও কিছু রুশ শব্দ শিখে গেছি। তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য রাখতে হয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রুশ নাগরিকদের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই এলাকায় আধুনিক খাবারের দোকান, কফিশপ ও ফলের আড়ত গড়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে করতেই স্থানীয়রা নতুন ধরনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন।
শুধু ব্যবসা নয়, বিনোদন খাতেও এসেছে পরিবর্তন। ঈশ্বরদীর জয়নগর এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক রিসোর্ট ও অবকাশকেন্দ্র, যেখানে নিয়মিত বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতি দেখা যায়। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, রূপপুর প্রকল্প না হলে এমন বিনিয়োগের চিন্তাও করা যেত না।
গত ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ধাপ। একই সঙ্গে এ প্রকল্প বদলে দিয়েছে ঈশ্বরদীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক তথ্য কর্মকর্তা মো. সৈকত আহমেদ বলেন, এই প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কয়েক বছর আগেও যেসব এলাকা ছিল প্রায় জনবিচ্ছিন্ন, এখন সেগুলো আধুনিক নগর সুবিধার আওতায় এসেছে।
মন্তব্য করুন