
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১১১ নং শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষা ও ক্রীড়ায় সাফল্য অর্জন করে চলেছে। তবে ১৬ বছর ধরে পরিত্যক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বাধ্য হয়ে পাশের একটি সাইক্লোন সেন্টারের ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও মাঠ ভরাটের দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে জানা গেছে, বারইখালী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত তিন কক্ষবিশিষ্ট ভবনে পাঠদান চললেও ২০১০ সাল থেকে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ভবনের পলেস্তারা খসে পড়া এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে তখন থেকেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে পাশের সাইক্লোন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শ্রেণিকক্ষ সংকট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব মাঠ থাকলেও তা ভরাট না থাকায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে। প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ও ভাঙা সাঁকো পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে হয়, ফলে বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বিদ্যালয়টি শিক্ষার মানে এলাকাজুড়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ক্রীড়াক্ষেত্রেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের গোলকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে বালিকা দল ইউনিয়ন পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ৩০৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেলা পর্যায়ে জায়গা করে নেয়। ২০১৭ সালে উচ্চলাফ প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণ ও ট্যালেন্টপুলে সর্বোচ্চ ৯টি বৃত্তি অর্জন করেছে। জন্মলগ্ন থেকে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০০-এর বেশি থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৫০-এ নেমে এসেছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, মাঠ না থাকায় পর্যাপ্ত অনুশীলন করা সম্ভব হয় না। সাইক্লোন সেন্টারের নিচে সীমিত জায়গায় অনুশীলন করেই তারা উপজেলা পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে। বালিকা দলের অধিনায়ক সুমাইয়া, সহ-অধিনায়ক মাইশা মনি ও জান্নাতি বলেন, “মাঠ ও ভালো প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকলেও আমরা উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছি। জেলায় গিয়ে ১-০ গোলে হেরেছি, তবে ভবিষ্যতে আরও ভালো করার চেষ্টা করব।” তারা মাঠ ভরাট করে খেলার উপযোগী পরিবেশ তৈরির দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিরাজুল ইসলাম, আকাশ মিস্ত্রী ও জিহাদ হোসেন জানান, প্রত্যন্ত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ভালো ফলাফল করছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, বাড়িতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মনিটরিং এবং প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাতেও পড়াশোনার ব্যবস্থা করায় শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে।
প্রধান শিক্ষক মোসাম্মৎ তাছলিমা খানম বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতি বছরই ভালো ফলাফল করছে। বৃত্তি পরীক্ষায় একসময় ৪টি থেকে ৯টি পর্যন্ত বৃত্তি পাওয়া গেছে। তবে ২০১০ সাল থেকে পুরোনো ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মাঠ থাকলেও ভরাট না হওয়ায় খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন ভবন নির্মাণ, মাঠ ভরাট ও বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণের জন্য একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে সয়েল টেস্টও সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি জানান।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার শেফাইনূর আরেফীন বলেন, উপজেলায় ইতিমধ্যে ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নতুন করে পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সার্ভে চলছে। পর্যায়ক্রমে এসব বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্তব্য করুন