
মোংলা শহরের আবাসিক সিঙ্গাপুর হোটেলে এক নারী এনজিও কর্মীর গোসলের ভিডিও গোপনে ধারণের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার পর হোটেলটির কয়েকটি কক্ষ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও হোটেলকর্মীদের দাবি, হোটেলের চারটি কক্ষকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, গোপন তৎপরতা ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের আলোচনা ছিল। গত ৫ মে পেশাগত কাজে মোংলায় এসে ওই নারী এনজিও কর্মী হোটেলটিতে ওঠেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কক্ষসংলগ্ন বাথরুমে গোসলের সময় পাশের বাথরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে মোবাইল ফোনে তার ভিডিও ধারণ করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে তিনি হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানান এবং পরে মোংলা থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে হোটেলের ম্যানেজার মোহাম্মদ মহসিন (৪০) ও কর্মচারী বনি আমিনকে (২৩) গ্রেপ্তার করে। মামলার আরেক আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত জব্দ করা হয়েছে এবং সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও হোটেলকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোটেলের ৪, ১৫, ২১ ও ২২ নম্বর কক্ষ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ছিল। কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, এসব কক্ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মিত রেজিস্ট্রেশন অনুসরণ করা হতো না। কিছু ক্ষেত্রে ঘণ্টাভিত্তিক চুক্তিতে কক্ষ ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ওই কক্ষগুলোকে কেন্দ্র করে মাদকসংশ্লিষ্ট আড্ডা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ছিল। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচিত চারটি কক্ষের একটিতেই অবস্থান করছিলেন ওই নারী এনজিও কর্মী। পরে ওই কক্ষের বাথরুমসংলগ্ন অংশ থেকেই গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগ ওঠে।
হোটেলসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েকটি কক্ষ আলাদা নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। বিষয়টি নিয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা থাকলেও সবাই সবকিছু জানতেন না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, আলোচিত চারটি কক্ষের দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণ মূলত ম্যানেজার মহসিনের অধীনেই ছিল। তবে বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ম্যানেজার মহসিনের বাড়ি মোড়েলগঞ্জ উপজেলার গুলিশাখালী এলাকায়। তার বাবার নাম মো. নুরু ফরাজী। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি হোটেলটির ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন।
একাধিক সূত্র আরও জানায়, এর আগে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। সেখানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হোটেলটির মালিক তালুকদার আখতার ফারুক স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তিনি একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। তবে বর্তমান ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পায়নি তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি এখনো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। ডিজিটাল আলামত, কক্ষ ব্যবস্থাপনার নথি এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্য যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার পর মোংলার আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তা, অতিথিদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং কক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি হোটেল নয়, পুরো আবাসিক খাতের তদারকি নিয়েই প্রশ্ন তুলবে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সব অভিযোগই প্রাথমিক এবং যাচাইসাপেক্ষ।
মন্তব্য করুন