
তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা যখন রেকর্ড ছুঁয়েছে, তখন বাগেরহাটের রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থেকে জাতীয় গ্রিডে বড় অবদান রাখছে। গত এপ্রিল মাসে কেন্দ্রটি ৭৬০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা চালুর পর এক মাসে অন্যতম সর্বোচ্চ উৎপাদন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের ডলার সংকট ও কয়লা আমদানির জটিলতা কাটিয়ে ওঠা এবং দক্ষ জনবল কাঠামো গড়ে তোলার ফলেই এই ধারাবাহিক উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে কেন্দ্রটি পাঁচবার এক মাসে ৭০০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে সর্বোচ্চ ৭৭২ মিলিয়ন ইউনিট এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৭৬৯ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি ও মার্চ মাসেও উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন ইউনিটের ওপরে ছিল।
তবে এপ্রিল মাস ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা তৈরি হয়। সেই চরম চাপের মধ্যেও রামপাল কেন্দ্রটি তার সক্ষমতার প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সচল ছিল এবং মাসজুড়ে গড়ে ৮০ শতাংশ সক্ষমতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
২০২৩ সালে কেন্দ্রটির বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডলার সংকট ও ঋণপত্র (এলসি) জটিলতা। কয়লা সংকটে একাধিকবার উৎপাদনও বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) এবং বিদ্যুৎ বিভাগ কয়লা আমদানির পেমেন্ট মডেলে পরিবর্তন এনেছে। সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে ডলার সরবরাহের বিশেষ চ্যানেল চালুর ফলে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া পরিশোধ সহজ হয়েছে। ফলে গত কয়েক মাসে প্রায় ৮ লাখ মেট্রিক টন কয়লা খালাস করা হয়েছে এবং বর্তমানে কেন্দ্রে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি মজুদ রয়েছে। এই বাফার স্টকের কারণে এপ্রিল মাসে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পটির পরিচালনা ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ভারতীয় প্রকৌশলীদের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকলেও এখন বাংলাদেশি প্রকৌশলীরাই মূল দায়িত্ব পালন করছেন।
বিআইএফপিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমানাথ পূজারী বলেন, “বর্তমানে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি প্রকৌশলীরাই কেন্দ্রটির দৈনন্দিন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন। ভারতের এনটিপিসি এখন কেবল কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে।”
গত এক বছরে প্রায় ৩৫০ জন বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যারা এখন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে টারবাইন হল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করছেন।
সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় কেন্দ্রটি শুরু থেকেই পরিবেশগত দিক থেকে নজরদারিতে ছিল। তবে আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কয়লার দহন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনি এবং ফ্লু গ্যাস ডি-সালফারাইজেশন (এফজিডি) প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষতিকর নির্গমন আন্তর্জাতিক মানের নিচে রাখা হচ্ছে।
সিনিয়র সাংবাদিক এম এ সবুর রানা বলেন, রামপাল এখন কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি জাতীয় গ্রিডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভোল্টেজ স্থিতিশীল রাখতে এবং শিল্পাঞ্চল সচল রাখতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এপ্রিলের সংকটকালে কেন্দ্রটি উল্লেখযোগ্য অবদান না রাখলে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি তৈরি হতো।
মন্তব্য করুন