
পার্বত্য জনপদের আকাশে-বাতাসে এখন উৎসবের রঙ। খাগড়াছড়ি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণের উচ্ছ্বাস, আর সেই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঐতিহ্যের মহোৎসব বৈসাবি উৎসব।
জেলা পরিষদের তিন দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিনেই শহর যেন রঙিন স্বপ্নে রূপ নেয়। সকালবেলায় পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। রঙিন পোশাক, বৈচিত্র্যময় অলংকার আর নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে হাজারো পাহাড়ি ও বাঙালি নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।
শোভাযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে জীবন্ত হয়ে ওঠে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্য। ত্রিপুরাদের গরয়া নৃত্য, মারমাদের ঐতিহ্যবাহী পানি খেলা আর চাকমাদের নৃত্যশিল্প দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে তোলে। নৃত্য-গীত, বর্ণিল সাজসজ্জা আর লোকজ পরিবেশনায় পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত উৎসবমুখর অভিজ্ঞতা।
বিকেলে শুরু হয় উৎসবের দ্বিতীয় পর্ব। পাজন রান্না প্রতিযোগিতা আর ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের টেনে নেয় ভিন্ন এক আকর্ষণে। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এমন সুযোগ যেন হাতছাড়া করতে চান না কেউই। শহরের নানা প্রান্তে বসে মেলা, সাজানো হয় পিঠা-পুলির স্টল, আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভরে ওঠে সন্ধ্যা।
উৎসবের ধারাবাহিকতায় রয়েছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সমাপনী দিনে পুরস্কার বিতরণীর মাধ্যমে শেষ হবে এই আয়োজন, তবে স্মৃতিতে রয়ে যাবে এর রঙিন আবহ।
আয়োজকদের ভাষায়, বৈসাবি শুধু একটি উৎসব নয়—এটি পাহাড়ি জনপদের আত্মপরিচয়। জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজুর সম্মিলিত রূপই বৈসাবি, যা ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। অন্যদিকে চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা মনে করেন, এই উৎসব সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।
মাহা সাংগ্রাই উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব নিয়ং মারমা ভাষায় বলেন, সাংগ্রাই মানেই নতুন সূচনা—পানি খেলার মাধ্যমে পুরনো ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দ।
উৎসবের পরিধি শুধু একদিনে সীমাবদ্ধ নয়। ১০ এপ্রিল থেকে শুরু হবে মারমা সম্প্রদায়ের ছয় দিনব্যাপী সাংগ্রাই উৎসব, যেখানে থাকবে পানি উৎসব ‘রি-আকাজা’, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও শোভাযাত্রা। ১২ এপ্রিল চাকমাদের বিজু শুরু হবে নদীতে ফুল ভাসানোসহ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ১৩ এপ্রিল ত্রিপুরাদের বৈসুতে থাকবে ফুল ভাসানো, গরয়া নৃত্যসহ নানা আয়োজন, যা চলবে সপ্তাহজুড়ে।
তবে এবারের আয়োজনের একটি বিশেষ দিক রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘বৈসাবি’ নামটি ব্যবহার না করে পৃথকভাবে বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু, পাতা, চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ নামে উৎসবগুলো উদযাপন করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে খাগড়াছড়ি এখন এক বিশাল আনন্দের প্রাঙ্গণ। পাহাড়ি জনপদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর সম্প্রীতির এই মিলনমেলা প্রতিবছরের মতো এবারও ছড়িয়ে দিচ্ছে রঙিন আবহ, যা মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে—সম্প্রীতির বন্ধনে, সংস্কৃতির বন্ধনে।
মন্তব্য করুন