
ঢাকার দক্ষিণখানে স্ত্রী আফরোজাকে হত্যা করে তার মরদেহ বাড়ির সীমানায় মাটিচাপা দিয়ে কানাডায় পালিয়ে যাওয়া আশরাফুল আলম সুমন অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রায় তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর সম্প্রতি দেশে ফেরার সময় তাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ৫১ বছর বয়সী আশরাফুল ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন দেশে ফেরার সময় ধরা পড়েন। পরে তাকে দক্ষিণখান থানা-তে হস্তান্তর করা হয় এবং বর্তমানে কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন। তিনি জামিনের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন চালাচ্ছেন।
দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, আশরাফুলের বিরুদ্ধে আদালত থেকে আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল এবং বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে তথ্য থাকায় দেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
তবে আশরাফুলের গ্রেপ্তারের বিষয়টি প্রায় এক মাস ধরে প্রকাশ্যে আসেনি। নিহত আফরোজার পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি পরে জানতে পারেন।
আফরোজার ছোট ভাই মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, মামলার অগ্রগতি জানতে আদালতে গিয়ে তারা প্রথম জানতে পারেন যে তার বোনের হত্যার মূল আসামি ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
তার অভিযোগ, আশরাফুল পরিকল্পিতভাবেই নির্বাচনের দিন দেশে ফিরেছিলেন যাতে বিষয়টি আলোচনার বাইরে থাকে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের বিষয়টি গোপন রেখে জামিন পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
২০২৩ সালের ২৭ মে ঢাকার দক্ষিণখানের নদ্দাপাড়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে নিখোঁজ হন ৪০ বছর বয়সী আফরোজা। চারদিন পর, ৩১ মে রাতে ওই বাড়ির সীমানার ভেতর মাটির নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
আফরোজার গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ভোগড়াবুড়ি গ্রামে।
নিখোঁজের পর ঢাকায় এসে দক্ষিণখান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তার ভাই আরিফুল ইসলাম। জিডির তদন্ত করতে গিয়ে সন্দেহের সূত্র ধরেই পুলিশ লাশ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণখান থানার এসআই রেজিয়া খাতুন সে সময় জানান, আফরোজার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কথাবার্তায় অসঙ্গতি দেখে তার সন্দেহ হয়। পরে কৌশলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়।
একপর্যায়ে জানা যায়, আফরোজা নিখোঁজ নন তাকে হত্যা করে বাড়ির সীমানার ভেতর মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
তখন আশরাফুল ইতোমধ্যে কানাডায় চলে গিয়েছিলেন। পরে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ভিডিও কলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
এসআই রেজিয়া খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, ৩১ মে রাতে ভিডিও কলে আশরাফুলই মরদেহ পুঁতে রাখার সুনির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে দেন। এরপর ওই জায়গা খুঁড়ে আফরোজার লাশ উদ্ধার করলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় আশরাফুল আলম ছাড়াও তার ভাই সজীব আলম, বাবা শামছুদ্দিন আহমেদ, খালা আইনজীবী পান্না চৌধুরী এবং সজীবের স্ত্রী তাহমিনা বাশারকে আসামি করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ আশরাফুলের বাবা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী এবং খালাকে গ্রেপ্তার করলেও পরে তারা জামিনে মুক্তি পান।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।
বর্তমানে মামলাটি জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। আগামী ৩০ মে এই মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
নিহত আফরোজার ভাই জানান, নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর এখন আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তার দাবি, মামলার এক আসামি ইতোমধ্যে দেশের বাইরে চলে গেছেন বলেও তারা জানতে পেরেছেন।
অন্যদিকে মামলার অন্যতম আসামি ও আশরাফুলের খালা আইনজীবী পান্না চৌধুরী দাবি করেছেন, তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন।
তার বক্তব্য, মরদেহ উদ্ধারে তিনি বরং পুলিশকে সহযোগিতা করেছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে ভালো নয় বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন