
বাগেরহাটের মংলায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ নিহতদের সংখ্য দাড়িয়েছে ১৪। তাদের অধিকাংশই একজন বিএনপি নেতার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় স্বজন। খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকায় মিতুর সঙ্গে বৃহস্পতিবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সাব্বির। নববধূকে নিয়ে মোংলার নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় সাব্বিরের পরিবার। খুলনার কয়রা থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে বাড়ির কাছের উপজেলা রামপালে এসে পৌঁছান তারা। এরপরই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় মোংলার এই বর ও কনের আর বাড়ি ফেলা হল না।
বেলাই ব্রিজ এলাকায় তাদের মাইক্রোবাস ও নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারান দুই পরিবারের ১৩ জন এবং মাইক্রোবাসের চালক। বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় বিষাদে। বাগেরহাটের রামপালে নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে নববধূ ও বরকে বহনকারী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ যায় ১৪ জনের; যাদের মধ্যে বর-কনেসহ একই পরিবারেরই সাতজন।
মাইক্রোবাসে নববধূকে নিয়ে বরের পরিবারের লোকজন বাড়ি ফিরছিলেন বলে জানান মোংলার এক বিএনপি নেতা। এ দুর্ঘটনায় মোংলার আরেক বিএনপি নেতা ও তার ছেলের মৃত্যু হয়। নিহত ওই ছেলের বিয়ে করাতে তারা খুলনার কয়রা গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার বিকালে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে আছেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ও তার ছেলে বর সাব্বির, সাব্বিরের নববধু মার্জিয়া আক্তার মিতু।
অন্যরা বিএনপি নেতার মেয়ে, নাতি, নাতনিসহ সাতজন। নিহত বাকিরা তার আত্মীয় স্বজন। তারা পশ্চিম শেলাবনিয়ার বাসিন্দা। মোংলা পৌর বিএনপির সদস্য খোরশেদ আলম রাতে বলেন, আব্দুর রাজ্জাক তার ছেলে সাব্বিরকে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকায় বিয়ে দেন।
এদিন সকালে পরিবারের সাতজনসহ কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে সেখানে যান। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিকালে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় মাইক্রোবাসটি। এতে বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক ও তার পরিবারের সাত সদস্যসহ ১২ জন মারা যান বলে জানান খোরশেদ আলম।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় কনে মার্জিয়া আক্তার মিতুর মামা আবু তাহেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুপুরে তার ভাগ্নি মিতুর বিয়ে হয়। “বিকালে মিতুকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি রওনা হয় বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসটি। রামপালের কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মিতু, তার বোন লামিয়া ও নানী মারা গেছেন। আর বরসহ মারা গেছেন আটজন।”
মোংলা পৌর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক খোরশেদ আলম জানান, মোংলা পৌরসভার ৮নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে সাব্বিরের বিয়ে হয়েছিল। তিনি ছেলে-পুত্রবধূ নিয়ে মোংলায় বাড়িতে আসছিলেন। পথে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে-পুত্রবধূ, মেয়েসহ আটজন, মাইক্রোবাসের চালক ও কনে পক্ষের লোকসহ মোট ১৪ জন মারা গেছেন।
বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে পুলিশের ওসি জাফর আহমেদ বলেন, নৌবাহিনীর বাসটি মোংলা থেকে ছেড়ে এসেছিল। আর মাইক্রোবাসটি খুলনা থেকে মোংলায় যাচ্ছিল। বেলাই ব্রিজের কাছে দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
“তাতে তিন নারীসহ মাইক্রোবাসের চারজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। স্থানীয় লোকজন এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।” রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সুকান্ত পাল জানান, তার হাসপাতালে মোট ছয়জনকে নেওয়া হয়েছিল।
“তাদের মধ্যে চারজন আগেই মারা গেছেন। দুইজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।”
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক মেহনাজ মোশাররফ বলেন, রামপালের দুর্ঘটনায় হতাহত ১১ জনকে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে আটজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চিকিসাধীন বাকি তিনজনের মধ্যে আরও দুইজন পরে মারা যান বলে এই চিকিৎসক জানান।
এদিকে, নৌবাহিনীর স্টাফ বাসের অন্তত ১৪ জন আহত সদস্যকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রæত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
রামপালে ভয়াবহ এই সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জনের প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জলবায়ু, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডাক্তার শেখ ফরিদুল ইসলামও এই দুর্ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
ইতিমধ্যে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ও পুলিশ সুপার হাসান চৌধুরী দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রামপাল থানায় এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন