
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কোলঘেঁষা ভোলা নদীর তীরবর্তী দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভুগছে। একটি খাবার পানির উপযোগী পুকুর খনন না হওয়ায় প্রায় ৩০ বছর ধরে এ গ্রামের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি উদ্যোগে দ্রুত একটি পানযোগ্য পুকুর খনন এবং পিএসএফ নির্মাণ করা হোক।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের ভোলা নদীর তীরবর্তী দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের গুলিশাখালী টহল ফাঁড়ি স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২০০ পরিবারের দেড় হাজার মানুষের বসবাস। পুরো ৭ নম্বর ওয়ার্ডজুড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষের বসতি থাকলেও গ্রামের এই অংশে নেই কোনো খাবার পানির পুকুর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৩০ বছর আগে ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদী পুনঃখননের পর নদীর তীরবর্তী এলাকায় দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামে মানুষের বসবাস শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও এখানে এখনো কোনো পানযোগ্য পুকুর খনন করা হয়নি। ফলে গ্রামবাসীকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের তালুকদার বাড়ির পুকুর থেকে ভ্যানযোগে পানি এনে ব্যবহার করতে হয়।
গ্রামের নারী-পুরুষ সবাইকে প্রতিদিন দূর থেকে পানি আনতে হয়। ভ্যানযোগে ২০ লিটার পানি আনতে খরচ হয় প্রায় ৫০ টাকা। অনেকেই বাধ্য হয়ে ভোলা নদীর জোয়ারের পানি তুলে ফুটিয়ে পান করেন। সুপেয় পানির এই সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামের মানুষ।
শুধু পানির সংকটই নয়, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্বলতাও এ গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। শিশুদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে প্রায় ২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে হাঁটুসমান কাদা ও পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে ভোগান্তির শেষ থাকে না।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালী পরিবারগুলোর জীবনেও রয়েছে নানা ঝুঁকি। প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণের আশঙ্কায় থাকতে হয় তাদের। অনেক সময় বাঘ লোকালয়ে ঢুকে বাড়িঘর থেকে গরু-মহিষ ধরে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে বাঘের গর্জনে ঘুম ভেঙে যায় গ্রামবাসীর। এছাড়া অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে একাধিক ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। নানা প্রতিকূলতায় এ গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামের বাসিন্দা ও ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের (বিটিআরটি) সদস্য আব্দুর বারেক হাওলাদার, কৃষক কবির সরদার, জেলে মামুন হাওলাদার, মৌয়ালী সাইফুল হাওলাদার, কৃষক মো. আজিজুর রহমান হাওলাদার, মাহাবুব তালুকদার, মেহেদী তালুকদার, শাহানাজ বেগম ও আয়শা বেগমসহ একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে প্রতিদিন খাবার পানি বহন করে আনতে হয়। ভ্যানযোগে পানি আনতে গেলে ২০ লিটার পানির জন্য প্রায় ৫০ টাকা দিতে হয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে কিছু ট্যাংকি বিতরণ করা হলেও এ গ্রামে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ তা পাননি। সরকারি উদ্যোগে একটি পুকুর খনন ও পিএসএফ নির্মাণ করা হলে দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানান, জেলা পরিষদের উদ্যোগে গত পাঁচ বছরে উপজেলায় খাবার পানির উপযোগী ৫০টি খাস পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। এছাড়া আইডিবি প্রকল্প, খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা পানি সরবরাহ প্রকল্প এবং সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার লিটারের প্রায় ১৮ হাজার পানির ট্যাংকি বিতরণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে পুকুর পুনঃখননের প্রকল্প আপাতত বন্ধ রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্প চালু হলে জরুরি সংকটাপন্ন এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
মন্তব্য করুন