
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ১১৪ পটুয়াখালী (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে জমে উঠেছে ভোটের মাঠ। দক্ষিনাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চার দিকে নদীঘেঁষা এই জনপদে এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখানে রয়েছে দেশের তৃতীয় বৃহত্তর সমুদ্র বন্দর পায়রা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। এ আসনটি শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। কার্যক্রম স্থগিত আওয়ামী লীগের ভোটের মাঠে অনুপস্থিতি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, দলটির ভোটব্যাংক কোনদিকে যাবে। তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দুই দলই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচাত এই দলটির ভোট টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে।
যদিও প্রার্থী সংখ্যা ৪ জন, তবে স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মূল লড়াইটি হবে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলন মধ্যেই। অতীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থানের কারণে এই আসনে অন্য দলের প্রার্থীদের জয়লাভ সহজ ছিল না। তবে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার প্রশ্নে ক্ষোভ জমে ওঠায় এবার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ না থাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটের ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২১ জানুয়ারী প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে ভোটের হিসাব-নিকাশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জনা যায়, কলাপাড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ২’টি পৌর সভায় ভোটার দুই লক্ষ চৌদ্দ হাজার ৪৮১জন। পুরুষ ভোটার-১০৮৮৩৬, মহিলা ভোটার-১০৫৬৪৫ জন এবং রাঙ্গাবালী উপজেলা ৫টি ইউনিয়নে ৯৪ হাজার ৮৬৪ জন ভোটার রয়েছেন এর মধ্যে পুরুষ ভোটার-৪৭৬৬১, মহিলা ভোটার-৪৭২০৩ জন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় নবীন ও প্রবীণ ভোটারদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবার।
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের অবসানের পর এবারের নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ, প্রত্যাশা ও কৌতূহল। সব কিছুই যেন এক নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। এক সময়ের আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ১১৪, পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) সংসদীয় আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্ধি¦তা গড়ে উঠেছে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের মধ্যে। পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর অংশগ্রহণ ভোটের সমীকরণে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। কলাপাড়া ও চার দিকে সাগরকুল নদীবেষ্টিত রাঙ্গাবালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরিশাল বিভাগের মধ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ-বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন (ধানের শীষ)। প্রতীক বরাদ্দের আগেই তিনি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে মাঠ গোছানো কাজ আগেই শেষ করেছেন।
বিএনপি নেতাকর্মীদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের নিজস্ব ভোট ব্যাংকের পাশাপাশি ভাসমান ভোটের বড় একটি অংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ-বিষয়ক সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন তথা পটুয়াখালী-৪ আসনের উন্নয়নের স্বার্থে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিন। কারণ এই জনপদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা বিএনপি শুরু করেছিল।’
কুয়াকাটা, পায়রা বন্দরের আগামি দিনের উন্নয়নে বিএনপির কোন বিকল্প নাই উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ একটা দল ইসলাম ও বেহেশতের কথা বলে সহজ সরল ধর্মভীরু ভোটারদের দ্বারে গিয়ে নানা কৌশলে ভোট চাচ্ছেন- এদের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ কে কোন দল করেন এটি বিষয় নয়, অন্তত উন্নয়নের স্বার্থে এবারে ধানের শীষে ভোট দিন।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোস্তফিজুর রহমান (হাতপাখা)। অধ্যাপক মোস্তফিজুর রহমান তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়, ইসলামী আদর্শ, সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন করছি। মানুষ পরিবর্তন চায়, আমি সেই পরিবর্তনের প্রতিনিধি হতে চাই।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ১০-দলীয় জোটের মনোনীত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ডা. জহির উদ্দিন আহমেদকে (দেওয়াল ঘড়ি) সমর্থন দিয়েছেন।
ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং একসময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী মাঠে তাকে কম সক্রিয় দেখা গেলেও তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ ও ভোটার ঐক্য গঠনে কাজ করছেন জোটের নেতাকর্মীরা।
এ আসনে গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য মো. রবিউল হাসান (ট্রাক) স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি ও সংস্কারের বার্তা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি মূল লড়াইয়ে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও ভোট বিভাজনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।
স্থানীয় ভোটারদের ধারণা, এবার বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন রাজনীতি চমক দেখাবেন। আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ত্যাগী ভূমিকা রাখা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে তরুণ। ওই নেতার নাম সবার মুখে মুখে। টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা, ইউনিয়ন পরিষদের ময়দান পর্যন্ত আলোচনায়। ফলে সব মিলিয়ে নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ ও বহুস্তরীয় প্রতিযোগিতামূলক এক লড়াই। এবিএম মোশাররফ হোসেন তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের মধ্যে তিনি আস্থাও অর্জন করেছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম শীর্ষ নেতা।
মেধাবী ও সাহসী নেতা হিসেবে রাজনীতিতে তার সুনাম রয়েছে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে বরাবরই সক্রিয় এবিএম মোশাররফ হোসেন। উপজেলা বিএনপিতে যোগদানের পর থেকে তিনি এলাকায় বিএনপির রাজনীতিকে সুসংহত করতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। নিজের জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি বিএনপিকেও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন বিএনপির এই নেতা।
পটুয়াখালী-৪ আসনটি ঐতিহাসিকভাবে ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় এবং ১৯৮৮ সালের ৩ মে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান এমপি হন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আনোয়ার-উল-ইসলাম নির্বাচিত হন। তখন থেকেই জাতীয় পার্টির কাছ থেকে আসনটি হাত ছাড়া হয়ে যায়।
শুধু ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলবিহীন বিতর্কিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে খালি মাঠে গোল দেওয়ার মতো বিএনপির মোস্তফিজুর এই রহমান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মতো আওয়ামী লীগের আনোয়ার-উল-ইসলাম নির্বাচিত হয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাহবুবুর রহমান জয়লাভ করেন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো মাহবুবুর রহমান এমপি নির্বাচিত হলে তাকে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় মাহবুবুর রহমান তৃতীয়বার এমপি হন।
ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা-হামলা ও অস্থিরতায় তারা ক্লান্ত। এখন তারা উন্নয়ন, শান্তি ও কর্মসংস্থান চায়। একজন ভোটার বলেন, আমরা এমন নেতা চাই, যিনি দলবাজি বা চাঁদাবাজি নয়, বরং মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন।
কৃষক ইউনুছ বলেন, টিভি চ্যানেল টকশোতে প্রিয় নেতা বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন বিজয় হলে মোগো দক্ষিনাঞ্চলে উনয়ন হবে। সাগরপারের মানুষ মোরা ব্যাপক উনয়নের দরকার। মোশাররফ হলে সিডর-আইলা বেরিবাধ ভাঙ্গা রাস্তাঘাটগুলো সরকার থেকে কাজ আইন্ন্যা মেরামত করবে।
জেলে জহির খান ভাষ্য মতে, পটুয়াখালী ৪ আসনে উন্নয়নের জন্য মোশাররফ কাজ করমো আনতে পারবে ওরে এইয়ানে এমপি বানানো দরকার। আমি জালইয়্যা মানুুষ টিভি চ্যানেলে ওর কথা হুনি।
মন্তব্য করুন