
চট্টগ্রামে অস্ত্র, খুন ও সন্ত্রাসের ক্রমবর্ধমান হুমকি নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে সাজ্জাদ বাহিনী শহরের অপরাধের মানচিত্র পরিবর্তন করছে। রায়হান ও মোবারকের নেতৃত্বে বাহিনী খুন, গুলি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে শহরজুড়ে এক ভয়ঙ্কর অপরাধের অধ্যায় তৈরি করেছে। বাহিনী বিদেশ থেকে নিয়মিত নির্দেশনা পাঠাচ্ছে।
চট্টগ্রামের চালিতাতলী এলাকার ঠিকাদার আবদুল গণির ছেলে সাজ্জাদ আলী ১৯৯৯ সালে কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খুনের পর অপরাধ জগতে পরিচিত হন। যদিও মামলায় খালাস পান, তার হাত ধরেই শহরে সন্ত্রাসের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা–কর্মীসহ আটজনকে হত্যার ঘটনায় তার নাম সংযুক্ত থাকে, যা ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত। ২০০৪ সালে তিনি দেশ ছাড়ার পর বিদেশ থেকে বাহিনী পরিচালনা শুরু করেন।
প্রাথমিকভাবে বাহিনী গড়ে ওঠে নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদের নিয়ে। ২০১৫ সাল থেকে নেতৃত্ব নেন ছোট সাজ্জাদ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বড় সাজ্জাদের দলে অন্তত ৫০ জন সক্রিয় শুটার ও সহযোগী রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেনের হাতে। দলের অন্যান্য সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—খোরশেদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের প্রমুখ। ছোট সাজ্জাদ ও রায়হান জামিনে বের হওয়ার পর বাহিনী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২৯ মার্চ বাকলিয়ায় গুলিতে দুজন নিহত হন। এরপর বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী ও রাউজানে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ও গুলির ঘটনা ঘটে। ৫ নভেম্বর বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর গণসংযোগে হামলায় পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন।
২২ এপ্রিল রাউজানে যুবদল কর্মী ইব্রাহিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা। ২৯ আগস্ট অক্সিজেন–পশ্চিম কুয়াইশে মাসুদ–আনিছ খুন। এর এক মাস পর চান্দগাঁওয়ে চায়ের দোকানে বসে ব্যবসায়ী তাহসীনকে হত্যা। ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে সন্ত্রাসী আকবর আলী খুনের মামলায় রায়হান আসামি। ৫ আগস্টের পর রায়হান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে খুনসহ ১৪টি মামলা হয়।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাহিনী তিন ভাগে বিভক্ত। ‘এ’ ক্যাটাগরি, যেখানে সাজ্জাদের নির্দেশে পরিকল্পনা করেন রায়হান–মোবারক। নিজেরা এখন গুলি চালান না। নিরাপদ স্থানে বসে হামলার স্কিম তৈরি করেন। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে খুন ও বড় হামলার মূল শুটার কাদের, নাজিম, বোরহান প্রমুখ। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে আশপাশ পাহারা, টহল, পালানোর পথ তৈরি, আহত বা লুট কার্যক্রমে সাপোর্ট।
ইফতেখার জানায়, ২০ আগস্ট হাটহাজারীর জাহাঙ্গীরের বাড়িতে গুলির ঘটনায় তিনি ছিলেন ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। সরোয়ার হত্যায় ছিলেন ‘সি’ ক্যাটাগরিতে। কে কোন ঘটনায় কোন ভূমিকায় থাকবে তা ঠিক করেন রায়হান ও মোবারক। বর্তমানে রায়হান ভারতে ও মোবারক দেশে আছেন।
এদিকে, বিদেশে বসে খুন–চাঁদাবাজির অভিযোগ বিষয়ে সাজ্জাদ আলী বলেন, বিদেশে ব্যবসা করি। দেশে ভাড়া ঘর থেকেও আয় আছে। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করব? উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
তিনি দাবি করেন, ছোট সাজ্জাদ বা রায়হানের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।
বিদেশে থাকা সাজ্জাদ আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বিদেশে ব্যবসা করেন এবং বাহিনী তৈরি করেননি। পুলিশের অতিরিক্ত সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, সাজ্জাদের বাহিনীই নগর ও জেলায় খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির ঘটনায় জড়িত। বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি সদস্যদের ধরতে অভিযান চলমান।
সূত্র : প্রথম আলো
মন্তব্য করুন