
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি মনোবল—যা শারীরিক অক্ষমতাকেও হার মানায়। এরই জীবন্ত উদাহরণ দিনাজপুরের হাকিমপুর হিলি পৌরসভার ছোট ডাঙ্গাপাড়ার ৬৫ বছর বয়সী অন্ধ আব্দুল মাবুদ। জন্ম থেকেই কম দেখতেন, এখন পুরোপুরি দৃষ্টি হারালেও থেমে যাননি জীবনের পথে। নিজের কাজে নিজের উপার্জনে আজও দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
স্ত্রীকে নিয়ে ছোট সংসারে কষ্টের মধ্য দিয়েই সন্তানদের মানুষ করেছেন মাবুদ। না খেয়ে থেকেও তাদের লেখাপড়া করিয়েছেন, বিয়ে-শাদি পর্যন্ত সব দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়—আজ সেই সন্তানরাই বাবা-মায়ের খোঁজ রাখেন না। নেই দায়িত্ববোধ, নেই সম্মান, নেই সামান্য যত্নও। ফলে বৃদ্ধ দম্পতিকে প্রতিদিন রাস্তায় ঘুরতে হয় নিজের জীবিকার জন্য।
প্রতিদিন সকালে কাঁধে বস্তা ঝুলিয়ে বাদাম, বুট, কটকটি ও মিঠাই নিয়ে বের হন তিনি। হিলি পৌর শহরের মাঠপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, চারমাথা, মহিলা কলেজ, চুড়িপট্টিসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভাঙারির বিনিময়ে এসব খাবার বিক্রি করেন। মানুষের দয়ার ওপর নয়—নিজের পরিশ্রমেই সংসার চালান মাবুদ।
চোখে না দেখলেও মনের চোখে পথ চিনতে পারেন। কোথাও ভুল হলে আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করেন, মানুষও তাকে সাহায্য করে। প্রায়ই তাকে দেখা যায় হাকিমপুর থানা মসজিদে নামাজ পড়তে। নামাজ শেষে বারান্দায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন তিনি। এখানেই তাকে চিনেছেন এলাকার বেশ কিছু মানবিক পুলিশ সদস্য, যারা প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ান।
এলাকার সাউফুল ইসলাম, রাসেদুল ইসলাম, এনামুলসহ একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রায়ই দেখি বৃদ্ধ দম্পতিকে বস্তা নিয়ে কষ্ট করে হাঁটতে। ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের এমন কষ্ট করতে হয় কেন? তবুও তারা কখনো কারও কাছে হাত পাতেন না।
মাবুদের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মানুষ করি কতো আশা নিয়ে। নিজেরা না খাইয়া তাদের খাইয়েছি। আজ তারা আমাদের চেনে না।
অন্ধ আব্দুল মাবুদ বলেন, ছেলেটারে মানুষ করতে নিজেরা না খাইয়া তারে খাইয়াছি। লেখাপড়া করাইছি, বিয়া দিছি। এখন সে খোঁজও নেয় না। কিন্তু বাঁচতে তো হইবো। তাই চোখে দেখি না তয় ফেরি করি। গেটুকু কামাই হয় তাই দিয়া চলে।
হাকিমপুর (হিলি) থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল হক জানান, প্রায়ই দেখি তিনি মসজিদে নামাজ পড়েন। তার জীবনের গল্প শুনে খুব কষ্ট পেয়েছি। অর্থের অভাবের চেয়েও বড় অভাব—সম্মান, ভালোবাসা ও যত্নের অভাব।
তিনি আরও বলেন, সমাজের সবার উচিত এমন মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
সচ্ছল সন্তান থাকা সত্ত্বেও অসহায় বাবা-মাকে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়—এ শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, পুরো সমাজের লজ্জা। আমাদের সমাজে যতদিন দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও মানবিকতার অভাব থাকবে, ততদিন অন্ধ আব্দুল মাবুদের মতো মানুষদের অন্ধকারেই পথ খুঁজে ফিরতে হবে।
মন্তব্য করুন