

আসাদ বেহেস্তী
আসছে বাজেট অধিবেশন
চলবে লম্বা ভাষণ,
তারই আগে জনগণে
খাবে নানান কষন,
প্রথম কষণ ব্যবসায়ীদের
কারণ ছাড়াই তারা,
দাম বাড়াবে নিত্য মালের
হিসাব-নিকাশ ছাড়া!
জ্যোছনা ও জননীর কোলেই ফিরলেন প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। তবে প্রাণহীন দেহে। জোছনাকাতর উচ্ছল রোমান্টিক পুরুষটিকে আর দেখা যাবে না। কেবলই নিথর দেহটি প্রিয় মাতৃভূমিতে পৌঁছে সকাল ৯টায়। এরপর বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নন্দিত এই লেখকের প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন। কেউ বাদ যাননি। দলমত নির্বিশেষে এসেছেন সবাই। এরপর বেলা আড়াইটায় জাতীয় ঈদগায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আর দাফনের সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তার লাশ এখন বারডেমের হিমঘরে।
৯ মাস ক্যান্সারে ভোগার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে মারা যান হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশ সময় গতকাল রোববার সকাল ৯টায় নিউইয়র্কের জনএফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে এ কথাশিল্পীর মরদেহ নিয়ে দেশের উদ্দেশে রওনা হন স্বজনরা।
হুমায়ূনের দাফন কোথায় হবে এ সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তার ছোট ভাই ড. জাফর ইকবাল। একই সঙ্গে জনপ্রিয় এ লেখকের গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হচ্ছে না বলে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পরিবার। তাকে রাজধানীর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, বনানী কবরস্থান অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দাফন করা হতে পারে। ঢাকার অদূরে গাজীপুরে হুমায়ূন আহমেদ নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেন নুহাশ পল্লী। প্রাকৃতিক নৈস্বর্গ নুহাশ পল্লী হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত প্রায় সব নাটক-সিনেমার অন্যতম শুটিং স্পট। লালরঙা মাটির পাহাড়িয়া ঢঙে সবুজ গালিচার বনের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রায় চল্লিশ বিঘাজুড়ে সবুজ গাছ-গাছালির মাঝে রয়েছে দৃষ্টি নন্দন স্কাল্পচার, থাকার ঘর, বসার ঘর, বৃষ্টি বিলাস, ভূত বিলাস, দিঘি লীলাবতী। কিছুদিন আগেও চিকিৎসা বিরতির সময় দেশে এসে নুহাশ পল্লীতে অবস্থান করেন সদ্য প্রয়াত এ লেখক।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়। তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন।
হুমায়ূন প্রধানত মধ্যবিত্ত জীবনের রূপকার। কিন্তু একেই একমাত্র উপজীব্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এমনও না। দূর এবং নিকট ইতিহাসও তার সাহিত্যে ঠাঁই পেয়েছে সমান গুরুত্বে। আর সে কেবল গল্প বলাই নয়, গল্পের ছলে পথের দিশা দেখিয়ে দেয়া। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠন হওয়ার অনেক আগেই ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’-এর মতো গল্প লিখেছেন হুমায়ূন। যে গল্পের মূল প্রত্যয় ঘাতকদের বিচার একদিন না একদিন হবেই। কেবল পথ দেখানো নয়, এ যেনো অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ। বহুব্রীহি নাটকে দুই শব্দের এক সংলাপ ‘তুই রাজাকার’। সে এমন এক উচ্চারণ, কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন,এই একটি সংলাপে হুমায়ূন যা করেছে, আমার তিনটি লেখায়ও তা সম্ভব ছিল না। সংলাপটি যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল, তা তো আমরা অনেকেই দেখেছি।
একাত্তর তথা মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের অহংকার। ইতিহাসের এই অবিস্মরণীয় অধ্যায়কে হুমায়ূন তার অন্যতম প্রধান উপজীব্য করে নিয়েছিলেন। ছোট ছোট উপন্যাস আর ছোট গল্পে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পর লিখেছেন ‘জ্যোছনা ও জননীর গল্প’। কার্যত এ সবই তার দায়বদ্ধতার ইতিবৃত্ত। সচেতন পাঠক মাত্রেরই লক্ষ্য করার কথা, হুমায়ূন কেবল আমাদের চারপাশের জীবনের ছবি এঁকেই ক্ষান্ত হয়নি। আমাদের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা করে তুলেছেন। প্রান্তিক লোকের মুখে ছড়িয়ে থাকা অনেক শব্দকে করে তুলেছেন পাংক্তেয়। অনাড়ম্বর শব্দ বিন্যাসে অনুপম সৌন্দর্য সৃষ্টির নতুন নজির স্থাপন করেছেন তিনি।
আক্ষেপ আজ একটাই হুমায়ূন সাহিত্যের দ্যুতি যখন বাইরে ছড়াতে শুরু করেছিল, তখনই কাল তাকে ছিনিয়ে নিল। কর্কট ব্যাধিতে আক্রান্ত হুমায়ূন অনেক আবদ্ধ কাজ অসম্পূর্ণ রেখে বিদায় নিলেন। হুমায়ূন বিদায় নিয়েছেন সত্য, তবু যে অমেয় অবদানে তিনি সকলের চিত্ত জয় করেছিলেন, তার আলোই তাকে অমর করে রাখবে। জ্যোস্নার ফুল হাতে ধরার সাধনার মৃত্যু হতে পারে না।

