http://www.gramerkagoj.com/

আর্কাইভ

আসাদ বেহেস্তী
নিম্নের চাপ শেষে
লঘুচাপ আসছে,
তার চাপে কৃষকের
ফসলটা ভাসছে।
ভেসে যায় ঘর-বাড়ি
ভেসে যায় সম্বল,
রিলিফেতে মেলে রুটি
আর দু’টো কম্বল!

বঙ্গবন্ধু, ইসলাম ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ
    A+ A A-

নাজমুল হক : হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের মহান স্থপদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত এক ক্ষণাজন্মা ব্যক্তিত্ব। শুধু বাংলাদেশে নয়, শুধু এই উপমহাদেশে নয়, সমগ্র বিশ্বে বঙ্গবন্ধুর সত বিশাল হৃদয়ের অধিকারি, চেতনাদীপ্ত, বজ্রকঠিণ, অগ্নিপুরুষ বার বার জন্ম গ্রহণ করে না। এমন একজন মানুষের জন্য, এমন একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী বিশ্ব মানবতার জন্য একটি জাতিকে, বিশ্ব বাসীকে দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী অপেক্ষায় থাকতে হয়। 
মানুষ বন্ধন থেকে, অন্ধ সংস্কার থেকে, দাসত্ব থেকে মুক্তি চাই। সে মাথা উঁচু করে মানুষের অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়। এই মুক্তি ও বাঁচার জন্য সে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে। একটি স্বাধীন ভূ-খন্ডের স্বপ্ন বাংলাদেশে বসবাসকারী অনেকে দেখেছেন। কিন্তু তার কেই বাস্তবে রূপদিতে পারে নি। সেই স্বপ্ন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাস্তবে রূপ পেয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তিনি বাঙ্গালীদের জন্য নির্মান করে দিয়েছেন একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের সীমানা। জন্ম নিয়েছে বাঙালি জাতির নিজস্ব জাতিরাষ্ট্র, গর্বিত আত্মপরিচয়।
সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার (বর্তমানে জেলা) টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ লুৎফুর রহমান ও শেখ সায়েরা খাতুনের চার কণ্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তৃতীয় সন্তার শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপারের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একখন্ড স্বাধীন মানচিত্র পেত না। মাথা তুলে দাঁড়াত না। পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে দিনের পর দিন চলতে হত এ দেশের মানুষের। আসত না বাঙালি জাতীয়তাবোধ।তিনি প্রতিটা ক্ষেত্রে দেশকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান রাষ্ট্রের দায়বন্ধতা শীর্ষক এক প্রবন্ধে বলেছেন, ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির পত্তন হয়েছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় যে ৩৫টি নির্দেশ শেখ মুজিবুর রহমান জারি করেন তা কর্তৃত্ব প্রতিরোধ এবং অস্বীকার কারার মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মাধ্যমে বাঙ্গালির নেতা, তিনি বাঙালির অধিকার ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরাসরি নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ’৫৮ এর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ এর ৬ দফা’ ৬৯ এর গণঅভ্যুথান এবং ৭০ এর নির্বাচনসহ এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণে প্রতিটা আন্দোলনে, সংগ্রামে তিনি জাতিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। বার বার কারাবরণ সত্ত্বেও তিনি পিছু পা হননি। সকল প্রকার শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তার রাজনৈতিক দূরদুর্শিতা, সাহস, বাগ্মিতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এ দেশের সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। তাইতো বেগম সুফিয়া কামাল বলেছেন, ‘দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যারা দুর্জয়ে করে জয়/ তাহাদের পরিচয় লিখে রাখে মহাকাল।
বাঙালি জনসাধারণ একটি স্বতন্ত্র, বিকল্প, স্বাধীন রাষ্ট্রের বাসিন্দা বোধ যুদ্ধের পূর্ব থেকেই বুকের মধ্যে, হৃদয়ের মধ্যে, বুদ্ধির মধ্যে লালন করত। ষাটের দশক থেকে বঙ্গবন্ধুর দুটি লক্ষ্য ছিল। একটি ছিলো স্পষ্ট অন্যটি ছিলো অস্পষ্ট স্বপ্ন। স্পষ্ট স্বপ্নটি ছিলো আওয়ামীলীগকে গড়ে তোলা। দেশব্যাপী সংগঠন বিস্তৃতি করা এবং আওয়ামীলীগের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে সিভিল সমাজ প্রতিষ্ঠ করা। অন্য স্বপ্নটি ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া। আত্মবিশ্বাস আর সাহসও ছিলো তার। দলের ব্যপ্তি মানুষের প্রতি ও নিজের প্রতি আস্থা আরো বাড়িয়েছিলো। সে কারণে ৬ দফাকে এক দফায় পরিণত করতে পেরেছিলেন। আর এটিই ছিলো তার অস্পষ্ট ছবি বা স্বপ্ন। এ লক্ষ্যে তিনি অবিচল ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস ছিলো তা ফুটে উছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়। বিশিষ্ঠ সাংবাদিক ফয়েজ আহম্মেদ মামলা চলাকালীন সময়ের একটি ঘটনা লিখেছেন, প্রধান আসামী শেখ মুজিবুর রহমান পাশে বসা তিনি। আদালতে কথা বলা নিষেধ। শেখ মুজিব কয়েকবার ফয়েজ আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে কিছু বলার জন্য। ফয়েজ আহম্মেদ বললেন, মুজিব ভাই কথা বলতে মানা-মাথা ঘোরাতে পারছি না। বের করে দেবে। তক্ষুনি উত্তর আসল উথেষ্ট উচ্চস্বরে ‘ফয়েজ বাংলাদেশে থাকথে হলে শেখ মুজিবের সাথে কথা বলতে হবে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক লিখেছেন, আজ থেকে ৪০ বছর পূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণ যোগাযোগ বিষয়ে আধুনিক নিয়ম কানুনের এক আশ্চর্য প্রতিফলন ঘটেছে সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ এই ঐতিহাসিক ভাষণে।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু অমর অক্ষয়। বিবিসি’র বাংলা বিভাগের জরিপে শ্রেষ্ঠ এই বাঙালি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় রয়েছে। বাঙালি হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী শান্তিপ্রিয় এবং মননশীল একটি জাতি। তিনি মিশে আছেন বাংলার সাথে, বাঙালির জাতীয়তাবাদের সাথে, মিশে আছেন এদেশের সংস্কৃতি, ভাষা, কবিতা ও গানের মাঝে। তিনি বাঙালির জাতীয়তাবাদের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। দেশে সৃষ্টি হওয়া আদর্শের সংকট, সুশাসনের সংকট, রাজনৈতিক-সামাজিক, সাংস্কৃতিক বলয়ের প্রেক্ষাপটে গণগন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জাতীয়তাবাদ রাজনীতিকে সামনে রেখে নেতৃত্ব দিয়েচিলো বঙ্গবন্ধু। সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অর্ন্তগত চেতনায় যে মূল্যবোধগুলো বেরিয়ে এসছিলো স্বাধীনতা পরবর্তীতে সেগুলো দেশের শাসনতন্ত্রে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এ চার মূল্যবোধের লিখিত স্বীকৃতিও মিলেছিল।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত একজন মহান পুরুষ। ধর্মান্ধদের ইসলাম নয়-রসুলুল্লাহ (স) এই ইসলামই ছিল তার আদর্শ। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ব্যপক ভূমিকা পালন করেছেন। মুসলিম-অধ্যুসিত বাংলাদেশে এক শ্রেণীর ধর্ম-ব্যবসায়ী বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলো তারাও পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশপ্রেম তুলনাহীন। ‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’ এ কথাটি তিনি অন্তরে ধারণ করেছিলেন। ধর্মের নামে অনৈসলামিক কাজে নিয়োজিত ইসলামের শত্রুদের প্রচারণার রক্তাক্ত হয়েছেন। ধর্ম বিক্রি করে যারা আখের গোছানো কাজে নেমেছিলেন তারা হালে পানি পান নি। সত্তর সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকেই বাঙ্গালিরা ভোট দিয়েছিলো। স্বাধীনতা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুকে ইসলাম বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছিলো। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে নভেম্বরে বেতার-টেলিভিশনের ভাষণে বলেছেন ‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নয়। এ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য লেবেল সর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নয়। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রাসুলে করীম (স) এর ইসলাম, যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছেন ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতে তিনি বলেন, আমরা ইসলামের অবমাননা চাই না। আমাদের দেশ হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক দেশ। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান সুমলমানের ধর্ম পালন করবে, হিন্দু হিন্দুদের ধর্ম পালন করবে, খ্রীস্টান তার, বৌদ্ধ তার ধর্ম পালন করবে। এই মাটিতে ধর্মহীনতা নেই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এখানে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা চলবে না। সা¤প্রদায়িক রাজনীতি চলবে না। এ বক্তব্য বোঝা যায় তিনি কতটা ধর্মনিরপেক্ষতা ছিলেন।
তিনি সাড়ে নিত বছর দেশ পরিচালনায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পূর্নগঠন করেন, বাংলাদেশ তবলীগ জামাতের কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ স¤প্রসারণ করেন, টঙ্গীতে বিম্ব ইজতেমার স্থান করে দেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে। তিনি বাংলা ও বাঙালি জাতিকে বিশ্ব মুসলিম উম্মার সাথে পরিচয় করার লক্ষে ১৯৭৪ সালে ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় বাংলাদেশকে সদস্য করেন। সম্মেলনে যোগদান করার জন্য তিনি পাকিস্থানে যেতেও দ্ধিধাবোধ করেন নি।
প্রাক....‘৭১ এবং ১৯৭১-১৯৭৫ এর ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে উঠে বাংলাদেশের বিভিল সময়ে বঙ্গবন্ধুর অবদান, বাঙালির জাতীয়তাবাদ বিকাশে তিনি যেমন মহাবীর তেমনি ঈমানী জ্যোতিতে উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। তাকে বাদ দিয়ে প্রাক ও উত্ত বাংলাদেশে ইতিহাস রচনা করা অসম্ভব। তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। সৃষ্ঠিতে সহায়তা করেছিলেন এ জাতির জন্য স্বাধীন এ ভূখন্ডের।

লেখক : নাজমুল হক, রোভার স্কাউট ও কলাম লেখক, ই-মেইল : naymulrover@gmail.com, মোবাইল : ০১৭২০-৫৪৮৮৪৭