

আসাদ বেহেস্তী
নিম্নের চাপ শেষে
লঘুচাপ আসছে,
তার চাপে কৃষকের
ফসলটা ভাসছে।
ভেসে যায় ঘর-বাড়ি
ভেসে যায় সম্বল,
রিলিফেতে মেলে রুটি
আর দু’টো কম্বল!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইউরো জোনের অর্থসঙ্কট রুখতে যেমন আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলে (আইএমএফ) হাজার কোটি ডলার অনুদানের কথা ঘোষণা করলেন, তেমনই জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জানিয়ে দিলেন, আর্থিক ঘাটতি কমাতে এ বার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে তাঁর সরকার। যার অন্যতম, ভর্তুকির বোঝা কমানো। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের অনুকূল বাতাবরণ তৈরি করতেও তাঁর সরকার তৎপর বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ইউরো জোনের অর্থসঙ্কট মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কী বার্তা দেন, এ বারের জি-২০ শীর্ষ বৈঠকের গোড়া থেকেই সে দিকে নজর রাখছিলেন রাষ্ট্রপ্রধানরা। টানা তিনদিনের সমঝোতার পর ভারত হাজার কোটি ডলার অনুদানে সম্মত হওয়ার পাশাপাশি ইউরো জোনের দেশগুলিকে কড়া বার্তাও দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এদিন বলেন, “ইউরোপের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা দুর্বল হওয়াতেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তা আরও সঙ্কটাপন্ন হলে বিশ্বের অর্থনীতিই মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই বাজারকে ইতিবাচক বার্তা দিতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ইউরোপের দেশগুলিকে এখনই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ করতে হবে।” এই সঙ্গেই নিজের দেশের অর্থনীতির প্রসঙ্গও টানেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য দেশে আর্থিক সংস্কারের গতি রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় ইদানিং সর্বস্তরে সমালোচনা চলছে।
বিশেষত ‘এস অ্যান্ড পি’ বা ‘ফিচ’-এর মতো রেটিং সংস্থা যে ধরনের নেতিবাচক রিপোর্ট দিচ্ছে, তাতেও ভাবমূর্তি খানিকটা মলিন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মনমোহন জি-২০-র মঞ্চে বললেন, “অন্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির মতোই ভারতের বৃদ্ধিও ধাক্কা খেয়েছে। একে বিশ্বজনীন মন্দার বাতাবরণ বিনিয়োগের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে, তার ওপর ঘরোয়া বাধাবিপত্তিও বৃদ্ধির পথ আটকেছে। তবে ঘরের সেই সমস্যা শুধরনোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”
মনমোহন সিং বলেন, “গত অর্থবর্ষে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার কমে ৬.৯% হয়েছে। গোটা বিশ্বের পরিস্থিতির নিরিখে যা সঙ্গত বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু ভারতের মানুষ অসহিষ্ণু। তাঁরা যত দ্রুত সম্ভব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও চড়া হারে বৃদ্ধির পথে ফিরতে চান। যে হেতু ভারতের অর্থনীতির মৌলিক বিষয় ঠিক রয়েছে, তাই ৮ থেকে ৯% বৃদ্ধিতে ফেরার ব্যাপারে ভারত আÍবিশ্বাসী।” কিন্তু কী ভাবে তা সম্ভব?
প্রধানমন্ত্রীর জবাব, “২০০৮-এ মন্দা পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লি কিছু আর্থিক ব্যবস্থা (স্টিমুলাস) নিয়েছিল। তাতে আর্থিক ঘাটতি বেড়েছে। কিন্তু এ বার উল্টো পথে হাঁটতে চাইছে সরকার। এ জন্য কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা ছাড়া, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারের (টার্গেটেড সাবসিডি) মাধ্যমে বোঝা কমানোর পথে এগোতে চাইছে নয়াদিল্লি।”
প্রধানমন্ত্রী এ কথা বললেও ঘরোয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর আকা´িখত পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা সাউথ ব্লকের। পরিকাঠামো প্রকল্পে আরও বিনিয়োগ টানার ব্যাপারেও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “বিশ্বের অর্থনৈতিক বাতাবরণের প্রভাব ভারতে বিদেশি ও ঘরোয়া বিনিয়োগে পড়েছে। তবে বিনিয়োগের সহায়ক পরিবেশ রচনায় ভারত পদক্ষেপ করছে।” দেশে পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রসঙ্গে আজ জি-২০ভুক্ত দেশগুলির সামনে এক নয়া প্রস্তাবও রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “উন্নয়নশীল দেশগুলির সব থেকে বেশি প্রয়োজন পরিকাঠামো উন্নয়ন। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়, দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধির সহায়কও হয়। তাই যখন মন্দার বাতাবরণে বিনিয়োগ ধাক্কা খাচ্ছে, তখন বিশ্বব্যাঙ্ক, এডিবি-র মতো উন্নয়ন ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নে এ বার আরও বড় ভূমিকা নিতে হবে।”
ইউরোপের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে আজ জি-২০-র মঞ্চে দাওয়াইও দিতে চেয়েছেন মনমোহন।
তিনি বলেছেন, “সহজ যুক্তি হল, এখন ব্যয়সঙ্কোচ করলে তা ভবিষ্যতে সুস্থির বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করবে। কিন্তু বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গীও আছে। তা হল, এখন বৃদ্ধি যে ভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তাতে বহু দেশের একই সঙ্গে ব্যয়সঙ্কোচ নীতি নিয়ে চলাও যথাযথ ওষুধ নয়।”
ইউরো-সঙ্কট মোকাবিলায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অনুদান নিয়ে ৪৩ হাজার কোটি ডলারের তহবিল তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে তাতেও শেষ রক্ষা হবে কিনা, জানা নেই। তাই ইউরো জোনকে কঠোর বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী সতর্ক পা ফেলতে চাইছেন। এই জন্য গত মঙ্গলবার ব্রিক গোষ্ঠীভুক্ত বাকি তিনটি রাষ্ট্র চিন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন মনমোহন। তাতে স্থির হয়, ইউরো জোনকে বাঁচাতে এই চার দেশ অনুদান বাড়াবে। কিন্তু তার পরও দুর্দিনে নিজেদের বাঁচাতে আরও কিছু ব্যবস্থা নেবে। পৃথক অর্থকোষ তৈরি করা। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে যে তহবিলের সুবিধা নিতে পারে ব্রিক-ভুক্ত চার দেশই।

