

আসাদ বেহেস্তী
মানুষ মারার রাজনীতিতে
নেইতো কোনো দর্শন,
কিংবা গাড়ি ভাঙ্গা এবং
গুলি-বোমা বর্ষণ।
তবু যারা মানুষ মারে
চলে মহান নীতিতে,
তাদের দলে আমিতো নেই
কোনো রকম প্রীতিতে!
কাগজ ডেস্ক : মহাজোট সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিলে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন হটকেক ইস্যু হয়ে দাড়িয়েছে। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নির্দয় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারকে। সরকারকে নির্দয় সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করছে বিরোধী দল। সুযোগ বুঝে এক হাত নিতে ছাড়ছেন না সুশীল সমাজেরও কেউ কেউ। সেই সঙ্গে দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও যেন মিশে গেছে পদ্মার নীল জলে। তবে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করায় ঘটনায় ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের নৈতিক পতন ঘটে গেছে। নিজেদের অপরিপক্কতা, সমন্বয়হীনতা ও অদক্ষতার কারণেই সরকার এ সংকট নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে শুধু পদ্মা সেতু প্রকল্প নয়, অন্যান্য প্রকল্প নিয়েও তিক্ততা সৃষ্টি হবে। আর ভুলের মাশুল সরকারকেই দিতে হবে। অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আশঙ্কা, পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অন্যান্য দাতা সংস্থার সাহায্য পাওয়ার পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে। আর এমনটি হলে এজন্য সরকারকেই জবাবদিহি করতে হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বুধবার পাবলিক লাইব্রেরি’র ভিআইপি লাউঞ্জে এক আলোচনা সভায় বলেছেন, যে দেশের মানুষ মাত্র ৯ মাসে দেশ স্বাধীন করতে পারে, সমুদ্র বিজয় করতে পারে, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারি, সেই দেশের মানুষ পদ্মা সেতুও করতে পারবে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব রাজনীতি মানলে কি আমাদের স্বাধীনতা আসতো বা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা যেতো? বিশ্বব্যাংক বা দাতারা যা বলবে তাই করতে হবে এমনটা নয়। আমাদের আর কিছু না থাকুক ১৬ কোটি মানুষ আর ৩২ কোটি হাত আছে। আমরা যমুনা ও অন্যান্য ব্রিজ করতে পেরেছি।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিরোধীদলের উচিত পদ্মা সেতু ইস্যুতে ফায়দা লুটার চেষ্টা না করে সরকারের পাশে থেকে সহায়তা করা। পদ্মা সেতু ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বহিঃবিশ্বে নিজেদের দ্বিধা-বিভক্ত জাতি হিসেবে পরিচিত করবেন না। তিনি বলেন, অন্য যেকোনো বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করুন, প্রয়োজনে আন্দোলনও করতে পারেন। কিন্তু অন্তত পদ্মা সেতু বিষয়ে সরকারের পাশে থাকুন। সরকারের টার্গেট, যেকোনোভাবে এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, দাতাদের দিকে আর না তাকিয়ে দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, জিডিপির বাইরে যে কালো টাকা আছে, তা থেকে এক চতুর্থাংশ বাজেয়াপ্ত করলেই কয়েকটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব। তাই বিশ্বব্যাংকের দিকে না তাকিয়ে থেকে দেশীয় অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণ করা হোক।
এ প্রসঙ্গে সিপিবি সভাপতি মনজুরুল আহসান খান টাইমস্ আই বেঙ্গলী ডটকমকে বলেছেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিষয়ে কতিপয় সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্রের মাধ্যমে সরকারের কাছে পেশ করেছে, এটা যেমন ঠিক আছে। তেমনই ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের কাজটি একতরফাভাবে বাতিল করা বা স্থগিত করার কোন যুক্তি বিশ্বব্যাংকের থাকতে পারে না। অতীতে এ ধরনের কোনো নজিরও নেই। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ যদি সত্যও হয় তাহলেও এজন্য প্রকল্প বাতিল করে নির্দোষ জনগণকে শাস্তি দেয়া নিন্দনীয়। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তির কঠোর শাস্তি এবং মিথ্যা প্রতীয়মান হলে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি জানান।
প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯০ কোটি ডলার (২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা)। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়। প্রয়োজনে আরো ৩০ কোটি ডলার দেবে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ছাড়াও এডিবির সঙ্গে ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার, আইডিবির সঙ্গে ১৪ কোটি ডলার ও জাইকার ৪০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। ফলে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩ কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এই সেতু বাস্তবায়নের। কিন্তু কিছু দিন না যেতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ আনে প্রধান অর্থ জোগানদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। মূল সেতু ও তদারকি পরামর্শক নিয়োগ বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এনে গত সেপ্টেম্বরে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রথম প্রতিবেদন জমা দেয় বিশ্বব্যাংক। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে। দুর্নীতি দমন কমিশন শুরু করে তদন্ত। এরই মধ্যে গত শুক্রবার বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো অপ্রত্যাশিতভাবে পদ্মা সেতু ঋণচুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের পথ ধরে এডিবিও টাকা দিতে অস্বীকার করে। তবে আইডিবি ও জাইকা চুক্তি বহাল রাখবে বলে জানিয়েছে। এরপর থেকেই এই বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়।

