শিরোনাম: রাজশাহী বিভাগে ৩১৪ জনের করোনা শনাক্ত       নারায়ণগঞ্জে নিখোঁজ অটোচালকের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার       রাজশাহীতে যুবককে কুপিয়ে হত্যা       নড়াইলে চিরনিদ্রায় শায়িত পর্বতারোহী রেশমা       লালপুরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকী পালিত       চীনের নজর এবার তাজাকিস্তানের দিকে       মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা বাড়তি শূল্ক আরোপ করবে কানাডা       নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা মাহাথিরের       গোপালগঞ্জে পানিবন্দি ৩ হাজার পরিবার       করোনা এড়াতে স্যানিটাইজ করবেন গাড়ির যেসব অংশ      
যশোরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং
পাভেল চৌধুরী
Published : Thursday, 16 July, 2020 at 1:12 AM, Update: 16.07.2020 2:43:53 AM
যশোরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং 
পূর্ব প্রকাশের পর)
ভাষাতত্ত্বের গূঢ় বিষয়াবলী নিয়ে তিনি বিস্তর লেখালেখি ও গবেষণা করেছেন। আন্তজার্তিক ভাবে তার সেইসব লেখালেখি আর গবেষণার গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে। ভাষাতত্ত্বের অনেক মৌলিক প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেছেন এবং সেইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ১৯৩২ সালের ২৯শে জুলাই কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষাতত্ত্বের বিচার সম্বন্ধে আপনার যোগ্যতার প্রশংসা অনাবশ্যক। — যে সময়ে আমি এই অনুশীলনে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম তখন এ পথে আমি ছিলাম একা। তাছাড়া বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে আমি সম্পূর্ণ আনাড়ি। অন্ধকারে আমার হাতে প্রদীপ ছিল না, হাৎড়িয়ে বেড়িয়েছি। যখন থেকে আপনার হাতে আলো জ্বললো, তখন থেকেই এ অধ্যাবসায় ত্যাগ করেছি।’ ১৯২২ সালে বিশ্ব-ভারতী ‘পাবলিক প্রপার্টি’ হিসাবে গণ্য হওয়ার সময় প্রথম পরিচালনা পরিষদে সদস্য হওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ শহীদুল্লাহ্কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু বিনয়ের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজেকে অযোগ্য বিবেচনা করে বিরল সম্মান প্রাপ্তির সে প্রস্তাবে তিনি রাজী হননি।
রবীন্দ্রনাথ এক সময় লিখেছিলেন, ‘প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ একখানিও প্রকাশিত হয় নাই। সংস্কৃত ব্যাকরণের একটু ইতস্তত করিয়া তাহাকে বাংলা ব্যাকরণ নাম দেওয়া হয়। বাংলা ব্যাকরণের অভাব আছে। ইহা পূরণ করিবার জন্য ভাষাতত্ত্বানুরাগী লোকের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিৎ।’ রবীন্দ্রনাথের এই প্রত্যাশা অনুযায়ী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ রচনা করেন। যা প্রকাশিত  হয় ১৯৩৬ সালে। বলা বাহুল্য, পুরোপুরি সংস্কৃত ব্যাকরণকে তিনি পরিহার করতে পারেননি সত্যি কিন্তু বাংলাত্ব প্রতিপালনে তাঁর আন্তরিক চেষ্টার স্বাক্ষর সেখানে ছিল।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র লেখালেখির ভাণ্ডার যেমন বিপুল তেমন বিচিত্র। ‘তাঁর সমগ্র রচনাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি একাধারে ভাষাবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক, গবেষক, লোকবিজ্ঞনী, পাঠ সমালোচক, অনুবাদক ও সৃৃষ্টিধর্মী সাহিত্যিক।’ কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ পর্যন্ত তাঁর সমগ্র রচনা সংগ্রহ পূর্বক পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের আন্তরিক তাগিদ তেমন দেখা গেল না। তাঁর প্রতি এটা আমাদের অবহেলা না উদাসীনতা, এ প্রশ্নকে এড়ান যাবে না।
১৯২৫ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন যে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে গৌড়ী প্রাকৃতের মধ্যে দিয়ে এবং বাংলা ভাষার উৎপত্তিকাল ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দ। তাঁর এই মতকে এবি কিথ ও অন্যান্য ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিতরা সমর্থন করেন। ইতিপূর্বে সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, গ্রিয়ারসন, হার্নলে প্রমুখ পণ্ডিতদের মত অনুযায়ী ধারণা ছিল মাগধি প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, উৎপত্তিকাল ৯০০ খ্রীষ্টাব্দ। বাংলা ভাষার ইতিহাস পূনর্গঠনের মত সিংহলি ভাষার ইতিহাস পুনর্গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। উইলহেম গাইনার প্রমুখ পণ্ডিতরা মনে করতেন সিংহলি ভাষা নব্যভারতীয় আর্য ভাষার পাশ্চাত্য শাখা ভুক্ত। ১৯৩৩ সালে এক প্রবন্ধে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমানপজ্ঞি উপস্থাপন করে অভিমত ব্যক্ত করেন যে সিংহলি ভাষা মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার প্রাচ্য শাখার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর লিখিত ‘বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত’ প্রকাশকাল ১৯৫৯, প্রথম বাংলা ভাষায় রচিত ‘সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক গ্রন্থ’। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, অমর কীর্তি। বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলের মানুষের ভাবগত সমন্বয় সাধনের জন্য এই অভিধানের বিকল্প নেই।
এতদ্সত্ত্বেও বিজ্ঞজনদের অভিযোগ সামর্থ ও প্রতিভা অনুযায়ী মুহম্মদ শহীদুল্রাহ্ মৌলিক গবেষণার কাজ কমই করেছেন। প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তিনি, সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন কিন্তু সেই সব প্রশ্ন আর সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্তের উপর দাঁড় করানর পর্যাপ্ত আয়োজন তিনি তেমন করেননি। পাশাপাশি এ কথাও বলা যায়, বিরল প্রতিভাধর এমন একজন মানুষকে দিয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সদিচ্ছার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর আহমদ শরীফের বক্তব্য উদ্বৃত করা যায়, ‘ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন সর্বজন স্বীকৃত ও শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত। তবু তার স্বকালে স্বদেশের স্বজনেরা তাঁকে কোনো উচ্চপদ দিয়ে তার দানের ও খ্যাতির ঋণ স্বীকার করেনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন রিডার হিসেবে, প্রফেসর রুপে নয়। এমনকি বাংলা একাডেমি কিংবা বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে তাঁর প্রশাসক, পরিচালক কিংবা চেয়ারম্যান পদ জোটেনি।’ স্মর্তব্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০ বছর বাংলা বিভাগে ভাষাতত্ত্বে অধ্যাপনা করেন তিনি, দূরহ এই শাস্ত্রে আমাদের দেশে তিনিই পথিকৃত। পরবর্তীতে যে মুষ্টিমেয় ক‘জন এ বিষয়ে অধ্যায়ন করেছেন তাদের প্রায় সকলেই তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুসারি।
একটা পশ্চাদপদ জাতির মানস গঠনের প্রয়োজনে যা কিছু করা দরকার তার সবকিছুই সাধ্যমত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ করেছেন। এ ক্ষেত্রে নিজের অবস্থানের বিষয়টি তাঁর কাছে ছিল গৌণ। ভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন অনড়। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে এদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে ভাষার প্রশ্নটি জোরাল হয়ে ওঠে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বরাবরই মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে তাঁর যুক্তি আর অবস্থান তুলে ধরেন। আমাদের ভাষা আন্দোলনের সময় বাঙলা ভাষার পক্ষে তাঁর সক্রিয় অবস্থান আন্দোলনকে বেগবান করতে সহায়ক হয়েছিল।
দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ১৯৬৯ সালের ১৩ই জুন, ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। জীবদ্দশায় দেশে বিদেশে সম্মান খেতাব তিনি পেয়েছিলেন যথেষ্ঠ। খুবই অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। ছিলেন প্রগাঢ় ধার্মিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় গোঁড়ামিও যে তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি এমন না। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে লিখেছেন বিস্তর। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় প্রবন্ধ সংকলন ‘কুরআন প্রসঙ্গ’। আরবি থেকে কুরআন শরীফের বাঙলা অনুবাদও তিনি করেছিলেন। জাতিগত আত্ন-পরিচয়ের প্রশ্নে তাঁর মনে কোনো বিভ্রান্তি ছিল না। এক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা আমাদের শুধু বিষ্মিত করে না, আত্ন-জিজ্ঞাসাও জাগায়। জাতিগত আত্ন-পরিচয়ের প্রশ্নে মন-প্রাণে তাঁর মতো দৃঢ় অভিমত ধারণ করতে আমরা এখন পর্যন্ত কতটুকু সক্ষম? ১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেন; ‘ আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তারচেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব কথা। মা-প্রকৃতি আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে  তা ঢাকবার জো টি নেই।’
কৃতজ্ঞতাঃ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ স্মারকগ্রন্থ, ১৯৮৫





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft