শিরোনাম: রাজশাহী বিভাগে ৩১৪ জনের করোনা শনাক্ত       নারায়ণগঞ্জে নিখোঁজ অটোচালকের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার       রাজশাহীতে যুবককে কুপিয়ে হত্যা       নড়াইলে চিরনিদ্রায় শায়িত পর্বতারোহী রেশমা       লালপুরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকী পালিত       চীনের নজর এবার তাজাকিস্তানের দিকে       মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা বাড়তি শূল্ক আরোপ করবে কানাডা       নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা মাহাথিরের       গোপালগঞ্জে পানিবন্দি ৩ হাজার পরিবার       করোনা এড়াতে স্যানিটাইজ করবেন গাড়ির যেসব অংশ      
হাটে স্বাস্থ্যবিধি, সোনার পাথর বাটি!
মিজানুর রহমান :
Published : Wednesday, 1 July, 2020 at 12:04 AM
হাটে স্বাস্থ্যবিধি, সোনার পাথর বাটি!অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত দারুণ এক কার্টুন চোখে পড়লো। ক্যাপশনে লেখা আছে: ‘পশুর হাটে মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি’! কার্টুনিস্ট মাস্ক পরিহিত দুটো গরুর ছবি এঁকেছেন। সেখানে এক গরু অন্য গরুকে বলছে ‘স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে কিন্তু’! অন্য গরুটা জবাবে বলছে ‘ছাগলগুলো মেনে চললে হয়’! বুঝতে বাকী রইল না কার্টুনিস্ট কি বলতে চেয়েছেন। নিজেকে ছাগল বলে মানতে খুব কষ্ট হলো। পর মুহূর্তেই মনে হলো গৃহপালিত ছাগল-গরুকে অনেক কিছুই শেখানো হয় এবং পশুরা সেগুলো মানেও, কিন্তু স্বাস্থ্যবিধিতো শেখানো হয়নি। শেখানোর পর না হয় দেখা যেতো তারা মানছে কি মানছে না! তবে আমাদের শেখানো হলেও আমরা যে তা মানছি না, এটা দৃশ্যমান। এটাই এখন দেশের সবখানের বাস্তবতা। অথচ সরকার এবার কুরবানির পশুহাটে স্বাস্থ্যবিধি মানতে মাস্ক পরিধান ও তিন ফুট শারীরিক দূরত্ব বাধ্যতামূলক করেছেন। ষাটোর্ধ্ব বয়সের কেউ যেতে পারবেন না হাটে। জোয়ান মানুষ হাটে যাবেন। করোনা হয়তো তাদের ধরবেনা !
দুদিন আগে হাটের বাস্তব অবস্থা নিয়ে পত্রিকায় যা বেরিয়েছে সেটা একটু দেখা যাক: ‘দীর্ঘ তিন মাস পর রাজশাহীতে গরুহাট বসেছে। রাজশাহী সিটি হাটে গরু ব্যবসায়ী ও ক্রেতাগণ কেউই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। বেশির ভাগ ক্রেতা-বিক্রেতার মুখেই মাস্ক নেই। মানছেন না সামাজিক দূরত্ব। ক্রেতারা এখনো হাটে না এলেও ব্যবসায়ীদের ভিড় জমেছে প্রচুর। গরু নিয়ে হাটে আসছে অনেক মানুষ। গরুহাটে এসে ক্রেতা-বিক্রেতারা করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কথা বেমালুম  ভুলে গেছেন। অনেকের কাছেই মাস্ক আছে। কিন্তু মুখে নেই, গলায় ঝুলছে। কেউ আবার কথা বলার সুবিধার্থে মুখ থেকে নামিয়ে রেখেছেন। হাট কমিটির পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, তা কেউ কানে তুলছেন না। এই হাটটি যেখানে করা হয়েছে, সেখানে রাজশাহী নগরের বর্জ্য ফেলা হয়। বৃষ্টিতে তরল বর্জ্য সারা হাটে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় হাঁটুসমান কাদার মধ্যে নেমে ক্রেতা-বিক্রেতারা কেনাবেচা করছেন। সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কোনো সুযোগই নেই। তবে হাট কমিটির দায়িত্বে যাঁরা, তাঁরা সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরেছেন। গরু কেনার পরে লোকজন তাঁদের কাছে ছাড়পত্র নিতে যাচ্ছেন। তখন তাঁরা মাস্ক নেই কেন, এই প্রশ্ন তুলছেন। মাইকিং করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু হাটে মানুষের চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছে, যেন করোনামুক্ত একেবারে স্বাভাবিক একটা অবস্থা। রাজশাহীর কাটাখালী থেকে গরু বিক্রি করতে এসেছেন আবদুল খালেক (৫৫)। তাঁর মুখে মাস্ক নেই। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো উত্তরই দিলেন না। নওগাঁর রানীনগর থেকে এসেছেন আবদুল মজিদ (৬০)। তাঁরও মুখে মাস্ক নেই। গরু টানাটানি করা নিয়েই ব্যস্ত থাকলেন। মুখে মাস্ক নেই কেন-এই প্রশ্ন করারই সুযোগ পাওয়া গেল না। মান্দার চৌবাড়িয়া থেকে এসেছেন সাজিদুর রহমান (৪৪)। তিনি গরু বিক্রি করে যাচ্ছিলেন। মাস্কের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি একবার শুধু প্রতিবেদকের দিকে তাকালেন। এরপর কোনো কথা না বলেই চলে গেলেন। রাজবাড়ী থেকে এসেছেন ব্যবসায়ী মঞ্জুর হোসেন (৬০)। তাঁর মাস্ক আছে। কিন্তু মুখ থেকে নামানো। বললেন, রাস্তায় পুলিশ ঝামেলা করতে পারে, সেই জন্য মাস্ক পরে এসেছেন। কিন্তু হাটে মাস্ক পরে কথা বলা যাচ্ছে না, কষ্ট হচ্ছে তাই নামিয়ে রেখেছেন। ফিরে যাওয়ার সময় আবার পরবেন। গরুহাট বসার খবর পেয়ে হাটের ভ্রাম্যমাণ হোটেলগুলোও চলে এসেছে। দীর্ঘদিন পরে খাবারের পসরা মেলে বসেছে। সব ধরনের খাবারও মিলছে। গরুহাটের দোকানগুলোতে গরুর ক্রেতা-বিক্রেতারা মাটিতে বসেই খান। শুধু বসার জায়গায় বস্তা বা পাটি বিছানো রয়েছে। সেখানেই গায়ে গা লাগিয়ে বসে পড়ছেন ক্রেতারা। জানতে চাইলে হাটের ইজারাদার নাকি বলেছেন, তাঁরা সব ব্যবস্থা নিয়েছেন। কিন্তু মানুষ তা মানছে না। আসলে মানুষ সচেতন নয়। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে তাদের করার কিছুই নেই।’
করোনার সংক্রমণের উর্ধমুখী ধারার ভেতর পশুর হাট বসবে কি বসবে না তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। শেষ পর্যন্ত বিশেষ বিধিমালা মানা সাপেক্ষে পশুর হাট বসবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সারাদেশ থেকেই পশু ব্যবসায়ী এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে পশুর বহু মালিক কুরবানির ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত হাটে পশু বিক্রির সুযোগ গ্রহণ করতে চলে গিয়েছেন ঢাকায়। অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহের জন্য এই পশু বেচাকেনা আবশ্যক হয়ে উঠেছে। দুস্থ গরিব মানুষেরা কোরবানির মাংস পাবার আশায় অপেক্ষায় থাকে বছর ভর। অন্যদিকে চামড়ার বাজারের জন্যও কোরবানির গরু-ছাগলের এই হাট প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সব দিক বিবেচনায় ঢাকা সহ সারাদেশে পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত। কিন্তু করোনার সংক্রমণের ঝুঁকির ভেতর এ ধরনের হাট কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তা বলা কঠিন।
সত্যটা হচ্ছে কোরবানির হাটকে ঘিরে চলে বড় ধরনের বাণিজ্য। এর সাথে বিপুল মধ্যস্বত্বভোগী জড়িত। হাটের ইজারা, হাসিল, পশুর ট্রাক বা ট্রলার থেকে চাঁদা আদায়ে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকেন। হাট না বসলে বা কম বসলে তাদের আয়ে টান পড়বে। তাই হাট বসানোতে আগ্রহ অনেকেরই। অথচ বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে কোরবানির পশুর হাট চালু হয়েছে। এছাড়া মাংস বাজারজাত করার আধুনিক প্রতিষ্ঠান এবং খামার গড়ে উঠছে। এবার তা সারাদেশে সম্প্রসারিত বা জোরদার করা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশনের কোনো আগ্রহ নেই। সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার বার্ষিক একটি বড় আয়ও আসে কোরবানির গরুর হাট ইজারা দিয়ে। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও এই হাট থেকে বেশ আয় করেন। অবস্থাদৃষ্টে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলবে ইচ্ছে করছে, ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’।
রাজধানীর খবর হচ্ছে, কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতি নির্ধারণ ও যাতায়াতকারীসহ সব শ্রেণীর নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন আঙ্গিকে বিশেষ বিধিমালা তৈরি করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। ক্রেতা, বিক্রেতা, মহাজন, ইজারাদার, ভলান্টিয়ারসহ পশুর হাটে যাতায়াতকারী সব প্রকার নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সার্বিক দিক চিন্তা করে ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিত করোনাকালের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেয়া নির্দেশনাবলী মেনেই নাকি এ বিশেষ বিধিমালা তৈরি করেছে ডিএসসিসি। স্বাস্থ্যবিধি মানতে বিশেষ কঠোরতা অবলম্বন করবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। মূলত পশুর হাটের মাধ্যমে যাতে রাজধানীতে করোনার প্রকোপ বাড়তে না পারে, সে জন্যই এসব উদ্যোগ নাকি নেয়া হয়েছে।
বলাবাহুল্য, পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং নিজের সুরক্ষা বজায় রাখতে করণীয় কড়াকড়িভাবে পালন ইত্যাদি কতটা সম্ভব তা খুব সহজেই অনুমেয়। হাটের সবাইকে মাস্ক পরানো এবং একে অপরের থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিতান্তই আকাশকুসুম স্বপ্ন। পশুর হাটে এটি করা দুরূহ এবং দু:সাধ্য। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে  মাঠে কোরবানির পশুর হাট বসিয়ে সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মানানো অসম্ভব। গত রোজার ঈদেও দোকানপাট খোলার সময় একই কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত পরিবহণের নামে মানুষকে ঢাকা ছাড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এর কারণে ঈদের পরে করোনার প্রাদুর্ভাবও বাড়তে শুরু করে। এবার খোলা মাঠে গরুর হাট বসানো হলে আরো বড় সর্বনাশ হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে কোরাবানির পশুর হাটের একটা যোগ আছে এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পও অনেকটা নির্ভরশীল কোরাবানির ওপরে। তাই দুই দিক রক্ষা করতে এবার কোরবানির পশুর হাটের জন্য অনলাইন হাট এবং ব্যবস্থাপনার কথাও বলছেন তাঁরা।
সারা দেশের জেলা উপজেলায়ও পশুর অস্থায়ী হাট বসানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এই হাটের সংখ্যা সারাদেশে পাঁচ হাজারের কম হবে না।
শুধু পশুর হাটই নয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে পশু কোরবানিও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে। জানা যায়, সারাদেশেই কোরবানির হাটের জন্য একটি স্বাস্থ্যবিধি তৈরি করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তারা বলছেন, পশুর হাটের এখনও অনেক বাকি। তার আগেই চূড়ান্ত হবে স্বাস্থ্যবিধি। সাধারণত কোরবানির চার-পাঁচদিন আগে পশুর হাট বসে। কিন্তু সারাদেশ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন হাটে পশু নেয়া শুরু হয় তারও এক সপ্তাহ আগে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৩১ জুলাই বা ১ আগষ্ট বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিকল্পনা করে করোনায় অর্থনীতি সচল রাখা যেতে পারে। কিন্তু এভাবে হাট বাজার খুলে দিলে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিও বাঁচবে না, মানুষও বাঁচবে না। এখনও সময় আছে, তাই পরিকল্পনা করে কোরবানির পশুর অনলাইন বাজার শক্তিশালি করতে হবে। কৃষক এবং ব্যাপারীদের কাছ থেকে গরু সংগ্রহের চেইন গড়ে তুলতে হবে। যেভাবে এবার শাক-সবজি, খাদ্য শস্য সংগ্রহ করা হয়েছে।’’ যতদূর সম্ভব কসাইখানার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামেও পশু কোরবানির জন্য নিয়ম করে দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রিভেনটিভ মেডিসিনের চিকিৎসক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন, ‘‘ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কারণে কোরবানি ও কোরবানির পশু বিক্রি বাদ দেয়া যাবে না। কিন্তু হাট বসিয়ে পশু বিক্রির ব্যবস্থা করে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাটা হবে ‘সোনার পাথর বাটি’। এটা যদি করা হয় তাহলে এই করোনায় পশুর হাটেই সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ হবে বলে মনে করছি।’’





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft