শিরোনাম: রাজশাহী বিভাগে ৩১৪ জনের করোনা শনাক্ত       নারায়ণগঞ্জে নিখোঁজ অটোচালকের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার       রাজশাহীতে যুবককে কুপিয়ে হত্যা       নড়াইলে চিরনিদ্রায় শায়িত পর্বতারোহী রেশমা       লালপুরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকী পালিত       চীনের নজর এবার তাজাকিস্তানের দিকে       মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা বাড়তি শূল্ক আরোপ করবে কানাডা       নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা মাহাথিরের       গোপালগঞ্জে পানিবন্দি ৩ হাজার পরিবার       করোনা এড়াতে স্যানিটাইজ করবেন গাড়ির যেসব অংশ      
প্যারিসের জানালা দিয়ে দেখি মধুসূদনকে
সুকুমার দাস
Published : Monday, 29 June, 2020 at 12:07 AM, Update: 30.06.2020 12:11:22 AM
প্যারিসের জানালা দিয়ে দেখি মধুসূদনকে "প্যারিসের জানালা"র আমন্ত্রণে গত ১০ জুন ‘মধু মেলা-২০২০’ ফেইসবুক লাইভে অংশ নিই। আয়োজন সম্পর্কে দুটি কথা বলতে চাই।
অনুজ প্রতিম আবৃত্তি শিল্পী,স্বল্পভাষী কাজী শাহেদ প্রথম যোগাযোগটা করে,পরে বিস্তারিত কথা হয় আবু জোবায়ের এর সাথে।সে আমার প্রিয়জন দেশের প্রখ্যাত ছড়াকার আবু সালেহ এর সুযোগ্য প্ত্রু,আর কাজী শাহেদ এর মামাতো ভাই এছাড়া আমার পুরানো ছাত্রী রথির স্বামী। ওরা বর্তমানে ফ্রান্সে বসবাসরত।
অনুষ্ঠান শুরুর দিকে চিন্তা ছিল দু'দিনের, পরে তিন দিন, শেষমেষ পাঁচ দিনে গিয়ে রক্ষা পায়। আয়োজন, উপস্থাপনা, যোগাযোগ সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী, পাশাপাশি গোছানো ও মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠান।
এ আয়োজনের মূল কারিগর ও চিন্তক ছিল সুদূর ফ্রান্সেরত জুবায়ের আর এদেশে বসে সবটা গোছানোর নায়ক নিভৃতচারী শাহেদ। জুবায়ের এর সাথে কথা বলতে গিয়ে ও আমার মানসপটে তুলে আনলো ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীর সেই জায়গা যেখানে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবনের ম্ল্যূবান প্রায় আড়াই বছর কাটিয়ে ছিলেন চরম অনিশ্চয়তা ও দারিদ্রতার মাঝে।
আসুন এবার আমরা ঘুরে আসি ভার্সাই নগরী থেকে। কেমন ছিল তখনকার এই নগরী,কতছিল তার লোকসংখ্যা ইত্যাদি।
মধু কবির জীবন খুবই স্বল্প সময়ের মাত্র ৪৯ বছরের। তবে তা ছিল বৈচিত্র্যময়তায় ভরা। তারই একটি অংশ মধু কবির ভার্সাই শহরের জীবন গাঁথা নিয়ে এ লেখাটি।
১৮৬২’র ৯ জুন সোমবার সকালে মধুকবি ব্যারিষ্টারী পড়তে বিলেতে পাড়ি জমান কান্ডিয়া জাহাজে চেপে। তিনদিন পর ১২ জুন মাদ্রাজ পৌঁছে, দুইদিন বিরতি দিয়ে পুনরায় ৪ সপ্তাহের যাত্রা শেষে লন্ডনের সাউথ্যাম্পটন বন্দরে পৌছলেন ১৯ জুলাই শনিবার ভোরে।
ভর্তি হলেন গ্রেজ ইন ইউনিভার্সিটিতে। ১৮৬৩’র জুনে মধুসূদন গ্রেজ ইন এ ৪টি টার্ম পড়া শেষ করেন। কলকাতাতে স্ত্রী হেনরিয়েটা ও সন্তানদের দেখাশোনা ও অর্থের ব্যবস্থার দায়িত্বরতরা মুখ ফিরিয়ে নিলে অসহায় হেনরিয়েটা সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে পৌছান ১৮৬৩ এর মার্চের শেষ দিকে।
সকলকে নিয়ে এই ব্যয়বহুল নগরীতে বসবাস কবির জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এমনই চিন্তা থেকে তিনি ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীকে বেছে নেন। এ ছাড়াও লন্ডনের তৎকালীন সমাজের বর্ণবাদী আচরণও কেউ কেউ মনে করেন তার ঐ শহর ছাড়ার আরেকটি কারণ। ১৮৬৩’র ১৭ জুন গ্রেজ ইন এ ট্রিনিটি টার্ম শেষ করেই তিনি লন্ডন ছাড়েন। এখানে ভর্তির সময় যে টাকা (১০০ পাউন্ড) জমা রেখেছিলেন তা থেকে ২০ পাউন্ড ধার করে তিনি ভার্সাই নগরীতে আসেন।
প্যারিস থেকে ১৫ মাইল দূরে ভার্সাই নগরী। রাজা চতুর্দশ লুই সপ্তদশ শতাব্দীতে  বিশাল এবং বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ গড়ে তোলেন এই ছোট্ট শহরে ১৬৭১ সালে।এই প্রাসাদে প্রায় ১০০০ কর্মকর্তা ও তাদের প্রায় ৪০০০ কর্মচারী বাস করতেন। শহরটি ১০০ বছরেরও বেশী সময় ছিল ফ্রান্সের রাজধানী। ছোট্ট এই শহরের লোকসংখ্যা ১৮৬০ এর দশকে ছিল মাত্র ৪০,০০০।
মধুসূদন এখানে প্রায় আড়াই বছর ছিলেন। এই সময়ে তিনি নিদারুণ অর্থ কষ্টে ভোগেন। চাকরি বা অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পারেন নি। তিনি ভার্সাই নগরী ‘রু দ্য শাঁতিয়ে’ রোডের ১২ নং বাড়িতে থাকার জন্য ঘর ভাড়া নেন। এটি ছিল তিন তলা বিশিষ্ট একটি ছোট্ট বাড়ি। এখানে ১৮টি পরিবার বাস করতেন। এই ১৮টি পরিবারের মধ্যে ১২টি পরিবার দাতব্য তহবিল থেকে সাহায্য নিয়ে জীবনধারণ করতেন। এ থেকে বোঝা যায় সেখানে বসবাসরতরা কতটা সাধারণ আর অভাবী ছিলেন। তবে কবি কখনো এখান থেকে অর্থাৎ এই দাতব্য তহবিল থেকে সাহায্য নিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তবে এ সময় এলাকার বিভিন্ন দোকানদারদের কাছ থেকে ধার করে, পরিচিতদের দয়ায় তিনি ও তাঁর পরিবার কোনো মতে বেঁচে ছিলেন এই শহরে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু ডানে গেলেই রাস্তার বামদিকে একটা গলি, সেখানে ছিল চার্চ। বাড়ি থেকে মাত্র তিন মিনিটের পথ ছিল। অভাবের মাঝে তিনি চার্চ থেকে সহযোগিতা পেতেন। তাছাড়া সে সময় তিনি যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়ির অন্য বাসিন্দারা দরিদ্র হলেও কবিকে তারা নানাভাবে সাহায্য করতেন। কবির প্রতি তাদের সহানুভূতি ছিল প্রচুর, এমনও দেখা গেছে তাদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে কবির ঘরের সামনে খাবার রেখে যেতেন। সে সময় কবির পরিবারকে প্রায়ই অনাহার-অর্ধাহারে কাটাতে হতো।
দেশ থেকে টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় ভার্সাই নগরীতে কবি প্রচুর দেনা করেন। সময়মতো শোধ দিতে না পারায় তারা নানা ধরনের ভয়, এমনকি আদালত পর্যন্ত দেখান। নিরুপায় হয়ে কবি কলকাতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় কে চিঠি লিখলেন ‘দিগম্বর মিত্র এর উপর ভরসা করে আমি চরম কষ্টে আছি, আপনি একমাত্র বন্ধু যিনি আমাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন’। সে সময় ফ্রান্স থেকে ভারতে চিঠি যেতে প্রায় ৫ সপ্তাহ লাগতো। কিন্তু অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, কবি ধৈর্য্য ধারণ না করে পরবর্তী ৪ সপ্তাহে আরো ৪টি চিঠি লিখেছিলেন ।
বিদ্যাসাগর মহাশয়কে প্রথম চিঠি লেখার পর ২ আগষ্ট ১৮৬৪তে যখন ৬ষ্ঠ চিঠি লেখেন সে সময় হেনরিয়েটার সন্তান প্রসবের মাত্র দু-চার দিন বাকি, হাতে মোটে ২০ ফ্রাঁ।এ চিঠি লেখার পরদিন অর্থাৎ ৩ আগষ্ট তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, সন্তানটি জন্মের পর পরই মারা যায়। ১৮ আগষ্ট আবার লিখলেন বিদ্যাসাগরকে- ‘সন্তান ভূমিষ্ট হয়েই মারা গ্যাছে। হাতে একটি পয়সাও নেই, এই চিঠি পাঠানোর জন্য যে ডাক টিকিট তাও কেনা হয়েছে বন্ধকী দোকান থেকে টাকা জোগাড় করে। আমার স্ত্রী ও আমার বিশ্বাস, নিশ্চয়ই ইতোমধ্যে আপনি টাকা পাঠিয়েছেন সাথে চিঠি এবং আগামী ডাকে তা আমরা পাবো’। সত্যি সে আশা পূরণ হয়েছিল।২৮ তারিখ ১৫০০ টাকা পেলেন চিঠি সহ। তখন কবির হাতে ছিল মাত্র তিন ফ্রাঁ, যার মূল্য এক টাকা।
এদিকে কবির বাড়ীর পাশেই মেলা বসেছে। সেখানে ভবনের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা মেলায় যাচ্ছে দেখে কবি পুত্র মিলটন ও কন্যা শর্মিষ্ঠা বায়না ধরলো মেলায় যাবার। কবি পত্নী এ কথা জানালে তিনি বললেন ‘চিন্তা করো না, আজকের ডাকেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট থেকে টাকা পাওয়া যাবে’। সত্যিই তাই হলো। তিনি টাকা পেলেন আর সন্তানরা মেলাতে গেলো।
বিদ্যাসাগরের কাছ থেকে টাকা পেয়ে তিনি কতটা খুশি হয়েছিলেন তা দেখা যায় তার পরবর্তী চিঠিতে, তিনি লিখলেন- ‘আমার মহান, আমার বিখ্যাত, আমার সত্যিকার বন্ধু, আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো’।
শত ঝামেলা-সমস্যা মাথায় নিয়ে কবি ফ্রান্সে থাকলেও লেখালেখি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।১৮৬৪'র ডিসেম্বরে তৃতীয় কিস্তির টাকা পাওয়ায় সংসারে তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ ফিরে আসায় ৬ হাজার মাইল দূরে ফেলে আসা মাতৃভূমির জন্য তার সমস্ত হৃদয় আকুল হয়ে ওঠে। পরিবেশ সামান্য অনুকূল হওয়ার সাথে সাথে তিনি একের পর এক সনেট লিখতে শুরু করেন। ‘কপোতাক্ষ নদ’সহ অসংখ্য সনেট তিনি এ সময় রচনা করেন।
দীর্ঘ আড়াই বছর ভার্সাই নগরীতে থাকবার পর ১৮৬৫’র সেপ্টেম্বরে পরিবার নিয়ে লন্ডনে ফিরে আসেন। ১৮৬৬’র ১৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে মধু কবির ডাক পড়ে গ্রেজ ইন সোসাইটির বারে। সেদিন বাংলার মহাকবিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্যারিষ্টার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরপর স্বল্প কিছুদিন কবি লন্ডনে ছিলেন।১৮৬৭ সালের জানুয়ারি মাসের ১ম সপ্তাহে পরিবারের সদস্যদের লন্ডনে রেখে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন।
শুরুতেই বলেছিলাম স্বল্প আয়ু:স্কালে কবির বাল্য-কিশোর জীবন, মাদ্রাজ পর্ব, এরপর কলকাতা, লন্ডন-ফ্রান্স আবার কলকাতার জীবন বৈচিত্র্যময় ও নাটকীয়তায় ভরা। সুতরাং কবির প্রত্যেকটি অংশ নিয়ে আলাদা করে লিখলেও শেষ করা যাবে না কবির অমর কীর্তি। ১৯৯৬ সাল থেকে কবির রচনা, জীবনী চর্চা করছি তাকে গভীরভাবে জানা-বোঝার জন্য। আমি তার সনেট, ব্রজঙ্গনা কাব্য, বিভিন্ন নাটকের গান নিয়ে কাজ করে চলেছি,ফলে তাকে সঠিক ভাবে না জানলে কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এজন্য আমি আমার সঙ্গীত গুরু প্রয়াত শাহ্ মোহাম্মদ মোর্শেদ হীরা ভাই এর নিকট ঋনী। তারই অনুপ্রেরণায় আমি এ কাজ করে চলেছি। তিনি যশোর তথা এই উপমহাদেশে মধুসূদনের রচনা সুরারোপ করে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন। আমি তার পথ ধরে এগিয়ে চলেছি, জানিনা কতদূর যেতে পারবো। কবির অন্যান্য বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা রইল। চলবে....

লেখক: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft