শিরোনাম: সাতক্ষীরায় আরও ৪৩ জনের করোনা শনাক্ত        সেপ্টেম্বরেই বাংলাদেশ-শ্রীলংকা সিরিজ!       জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা গ্রেফতার       সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ইসরায়েলের রাজপথ       সাহেদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী       যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট নয় : কাদের       ২৪ ঘণ্টায় ২৬৬৬ জনের করোনা শনাক্ত       আট বছর ধরে আজম দুবাইতে নারী পাচার করতো       আফগানিস্তান বিশ্বকাপ জিতলে বিয়ে করব : রশিদ খান       কাঠালিয়ায় করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরী সভায় কৃষি সচিব নাসিরুজ্জামান      
সোনালী আাঁশের সোনালী অর্থনীতি
অলোক আচার্য :
Published : Monday, 1 June, 2020 at 1:49 PM, Update: 02.06.2020 3:16:44 PM
সোনালী আাঁশের সোনালী অর্থনীতিসুপ্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে অর্থকরী ফসল হিসেবে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি পাটকে। সোনা রংয়ের আঁশে কৃষকদের চোখে ছিল সোনার স্বপ্ন। পাটের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল রমরমা। জীবন ও জীবিকার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল পাট কেন্দ্রিক। তাই পাঠ্য পুস্তকে পাটকে সোনালী আঁশ বলা হতো। পাট এবং পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হতো। ব্রিটিশ আমল এবং তার পরবর্তীতেও বহু বছর পাট-ই ছিল আমাদের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাটের ব্যবসায় বহু ব্যবসায়ী বিত্ত বৈভবের মালিক হয়েছে। আদমজীকে বলা হতো প্রাচ্যের ড্যান্ডি। তারপর অর্থনীতির গতি পরিবর্তন এবং দেশে পাটের অবস্থা তার সুনাম হারানোতে ধীরে ধীরে পাটের গুরত্ব কমতে থাকে। এর কারণ অবশ্য বহুমুখী। পাটের তৈরি উৎপাদিত দ্রব্যের বিকল্প দ্রব্য বাজার দখল করা এবং সেই সাথে অর্থনীতিতে বিকল্প খাতের উত্তরণ। পাটের বিকল্প বিভিন্ন উৎস থেকে বৈদেশিক আয় বাড়তে থাকে। বিপরীতে পাটের সাথে যাদের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল তাদের উৎসাহ কমতে থাকে। ফলে সেই অবস্থা ক্রমান্বয়ে জৌলুস হারাতে হারাতে আজকের অবস্থায় এসে পৌছেছে। বর্তমানে সরকার সহ সবাই চাইছে পাটকে সেই সমৃদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। ফলে নেয়া হয়েছে বহুমুখী পরিকল্পনা। ফলে পাটের বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। পাটের বহুমুখী ব্যবহার আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রতিনিয়ত পাট থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের নতুন নতুন ব্যবহার আসছে। পাটের উন্নত জাত আবিষ্কৃত হয়েছে। চলছে গবেষণা।
আমরা পাটের যে চিরাচরিত ব্যবহার জানতাম তার চেয়ে আরও বহুমুখী ব্যবহার আসছে। তার মধ্যে একটি হলো পাটের তৈরি পলিথিন। সারা বিশে^ আজ মাথাব্যথার কারণ হলো পলিথিন। বলা যায় আমাদের সভ্যতা ধ্বংসের পথে যাওয়ার পেছনে এটাকেও দায়ী করা হয়। পরিবেশবান্ধব এই পাটের তৈরি পলিব্যাগ এক মহাগুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। দেশের পাট শিল্প ও পরিবেশ রক্ষার সুবিধার্থে পাটের পলিথিন উৎপাদন করে একদিকে যেমন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব অন্যদিকে মানবজাতির বৃহৎ স্বার্থে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে। সোনালী ব্যাগ উৎপাদনের প্রকল্প নিলে ঢাকা শহরসহ সারাদেশ উপকৃত হবে। কারণ পাটের তৈরি পলিথিন ব্যাগ পরিবেশ বান্ধব,পঁচনশীল ও সহজলভ্য। একটা কথা তো সত্যি। বহুদিন পলিথিন ব্যবহারের ফলে মানুষ যে অভ্যাসের দাস হয়েছে তার থেকে সহজে মুক্তি নেই। তাদের হাতে এমন এক পণ্য তুলে দিতে হবে যা হবে আজকের পলিথিনের মতোই। তাই সমাধান সেই পলিথিনেই। যদি সেই পলিথিন হয় পরিবেশবান্ধব তাহলেই তার সমাধান সম্ভব। তাই পাটের তৈরি সোনালী ব্যাগ এর সহজ এবং চমৎকার একটি সমাধান। এখন প্রয়োজন এটি বাজারে ক্ষতিকর পলিথিন এর জায়গা দখল করার মতো উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ করা যাতে সহজেই সবাই এটি ব্যবহার করতে পারে। এর কাঁচামাল আমাদের দেশীয়। ফলে একদিকে এই সোনালি ব্যাগ রপ্তানি করেও  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি। পাশাপাশি পলিথিন থৈরি করতে যে কাঁচামাল আমদানি করতে হয় তা বেঁচে যাবে। সেক্ষেত্রে দরকার সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ ও প্রয়াস।
নিজেদের আবিষ্কার সারা বিশে^ ছড়িয়ে দিতে হবে। পাটের ব্যবহার আজ বহুমুখী। আর বহুমুখী হওয়ার কারণেই পাটের কদর বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। কৃষকরা এখন আগের তুলনায় পাট চাষে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এখন শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে যেনো প্রান্তিক চাষীরা পাটের ন্যায্য মূল্য পায়। পাটের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আবিষ্কারের মধ্যে একটি হলো পাট দিয়ে পরিবেশবান্ধব টিন তৈরি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী পাট দিয়ে এই পরিবেশ বান্ধব টিন তৈরি করে চমকে দিয়েছেন। এই বিজ্ঞানীর আবিষ্কারই হলো  পাটের সোনালি ব্যাগ, জুটিন বা ঢেউটিন, হেলমেট ও টাইলস। পাট থেকে তৈরি জুটিন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। এটা পাটের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার। পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কতৃপক্ষ পাটের বহুমুখীকরণের নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পাটের সবুজ পাতা থেকে ’চা’ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। যা সত্যিই চমৎকার। এটি এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করার পরিকল্পনাও হয়েছে। এ চায়ের ভেষজ গুণ থাকায় বিদেশে এর চাহিদাও রয়েছে। পাটের চা  ডায়াবেটিস,হৃদরোগ,কোলেস্টরলসহ  বিভিন্ন রোগ ও জীবাণু সংক্রমণ রোধে বেশ কার্যকরী। ইতিমধ্যেই তা রপ্তানি শুরুও হয়েছে। ফলে এর সম্ভাবনার দুয়ার নতুনভাবে খুলে গেছে। যে পাটকে বিশ^ কেবল সুতা,বস্ত্র বা এধরনের চিরচেনা কিছু পণ্যে দেখতো তা আজ পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ এর বহুমুখীকরণ হয়েছে। এখন প্রয়োজন তা ব্যপকভাবে মানুষের কাছে পৌছানো এবং বিদেশে রপ্তানি শুরু করেছে। আমাদের দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পাট চাষের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় পাটের চাষে কৃষকের আগ্রহ ছিল ব্যপক। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো যখন পাটের তৈরি দ্রব্যের বিকল্প আবিষ্কার এবং সেই সাথে পাটের পণ্য উৎপাদনে পিছিয়ে পরা। ফলে এই সোনাল ফল চাষ করার সাথে জড়িত মানুষগুলোর ভাগ্য উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে কাঁচা পাট রপ্তানি করার সাথে সাথে পাটের তৈরি সুতা,কুন্ডলী,পাটের বস্তা ও ব্যাগ,ম্যান মেইড ফিলামেন্ট এবং ষ্ট্যাপল ফাইবারস পাট ও পাটজাত পণ্য হিসেবে রপ্তানি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে দিন দিন পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ৭৯ কোটি ১৩ লাখ ডলার আয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি এবং গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে রপ্তানি আয়ে প্রথম বারের মতো দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে খাত। অর্থাৎ পাট ও পাটজাত পন্য এখন রপ্তানি আয়ের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে। রপ্তানি উন্নয়ন বুরে‌্যর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাট খাতে বিশেষ করে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে আয় ছিল ৬ হাজার ৪১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ সালে এই আয় বেড়ে দাড়ায় ৭ হাজার ২৯০ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাড়ায় ৭ হাজার ৬৮৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ হাজার ৯৬ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ৬ হাজার ৭৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা আয় হয়। এক তথ্যে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট উৎপাদন ছিল ৭৫ লাখ ৫ হাজার বেল যা পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ প্রথম এবং পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের বাইরেও আরও কয়েকটি দেশে পাট উৎপাদিত হয়। তবে বাংলাদেশই প্রাচীনকাল থেকে এর গুণগত মান ও ধরণের জন্য বিখ্যাত। আমাদের দেশে সাধারণত সাদা ও তোষা এই দুই ধরনের পাট উৎপন্ন করা হলেও তোষা জাতের পাটই বেশি চাষ করা হয়। কারণ এই জাতের পাট উন্নত এবং চাহিদাও বেশি। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৮ টি দেশে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে কাঁচা পাট রপ্তানি করা হচ্ছে। এরমধ্যে কাঁচা পাট রপ্তানি ছড়াও বিভিন্ পাটজাত পণ্য যেমন পাটের ব্যাগ, নানারকম কার্পেট, চট বস্তা সুতা ছাড়াও নানারকম বিলাস দ্রব্য রপ্তানি করা হচ্ছে। এই খাতে আরও গুরুত্ব তৈরি হয়েছে বা পাটের বাণিজ্যে আর গতি এসেছে ১৭ পণ্যের মোড়কে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পর থেকে। আগে যেসব পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার করা হতো না সেসব পণ্যে আজ পাটের মোড়ক ব্যবহার করা হয়। এর পর থেকে এই খাতে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এখন সারাবিশে^ পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে। ফলে যেসব পণ্যে গত কয়েক দশক ধরে প্লাষ্টিক ব্যবহার করার ফলে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দেয় হয়েছে সেখানে পাটের ব্যবহার আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের সাথে দেশের বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা অতীতের মতো আজও নির্ভর করে। আগে পাট উৎপাদনের সাথে বেশি মানুষ জড়িত ছিল। আর এখন পাটের তৈরি পণ্যের সাথে বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে।
পাট বিষয়ক আর্ন্তজাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল জুট ষ্ট্যাডি গ্রুপের হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে বিশে^ প্রতি বছর পাঁচ হাজার কোটি পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। পাটের সোনালী দিন ফিরিয়ে আনতে নানামুখী পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাটের সুদিন ফিরলে সেই সাথে এর সাথে জড়িত বহু মানুষের ভাগ্যও ফিরবে। কিন্তু একটা দিকে বরাবরই খেয়াল রাখতে হবে যেন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পায়। যদি তা না পায় তাহলে পাটের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব হবে না। কারণ এই প্রান্তিক চাষীদের হাত ধরেই পাটের দিন বদলের শুরুটা হবে। তাই তার সুফল সে পর্যন্ত পৌছানো নিশ্চিত করতে হবে।

অলোক আচার্য, সাংবাদিক ও কলাম লেখক, পাবনা। মোবাইল- ০১৭৩৭০৪৪৯৪৬ Email- [email protected]




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft