বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ৩ খুন
তত্ত্বাবধায়ক মাসুদসহ ৫ জন রিমান্ডে
১৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ, এসপির ব্রিফিং
দেওয়ান মোর্শেদ আলম
Published : Sunday, 16 August, 2020 at 1:05 AM
তত্ত্বাবধায়ক মাসুদসহ ৫ জন রিমান্ডেযশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পিটিয়ে তিন কিশোরকে হত্যা ও ১৫ জনকে আহত করার ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে আটক দেখিয়ে চালান দিয়েছে পুলিশ। আটক অন্যরা হচ্ছেন সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর (প্রবেশন অফিসার) মুশফিকুর রহমান, শরীর চর্চা শিক্ষক ওমর ফারুক ও কারিগরি শিক্ষক শাহানুর আলম।
অমানবিক ওই হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের ঘটনায় কর্মকর্তা কর্মচারী মিলিয়ে কেন্দ্র ংশ্লিষ্ট ১৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা করা হয়েছে। ঘটনাকে ‘নির্মম অমানুষিক ও পৈশাচিক’ আখ্যা দিয়েছেন যশোরের পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেন। তিনি ১৫ আগস্ট দুপুরে তার কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করে ঘটনার প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য উপাত্ত সরবরাহ করেছেন সাংবাদিকদের। জানিয়েছেন উপরে উল্লেখিত পাঁচ কর্মকর্তা হত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে। দেয়া হয়েছে আরও চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। এদিকে ঘটনার যথাযথ বিচার ও জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন নিহতদের স্বজনেরা।
১৩ আগস্ট দুপুরে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পরিকল্পিত মারপিটে নিহত হয় বগুড়ার শিবগঞ্জের তালিবপুর পূর্বপাড়ার নান্নু পরামাণিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), খুলনার দৌলতপুরের মহেশ্¦রপাশা সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮) ও বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মহিপুরের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল হোসেন ওরফে সুজন (১৮)। একই ঘটনায় ১৫ কিশোর গুরুতর আহত হয়। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম, যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান, এসপি মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনের ঝটিকা তদন্তে বেরিয়ে আসে রোমহর্ষক কাহিনী। তথ্য মেলে হত্যায় কর্মকতারা সরাসরি জড়িত। এঘটনায় পুলিশ প্রথম দফায়  ১০ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দ্বিতীয় দফায় নয় কর্মকর্তা, কমচারীকে হেফাজতে নেয়। নিহতদের মধ্যে পারভেজের বাবা রোকা মিয়া ১৪ আগস্ট রাতে থানায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অজ্ঞাত কয়েক বন্দিকে আসামি করে মামলা করেন। যার নম্বর ৩৫। মামলা রেকর্ডের পরে পুলিশ জোরেসোরে মাঠে নামে। তদন্ত কর্মকর্তা যশোর চাঁচড়া ফাঁড়ি ইনচার্জ ইন্সপেক্টর রোকিবুজ্জামানসহ আরও কয়েকটি টিম তদন্ত শুরু করেন।  
তদন্তে পুলিশ তথ্য পান ওই হত্যাকান্ডে হেফাজতে আনা কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি জড়িত। তাদের আজ্ঞাবহ ৭/৮ বন্দি কিশোরকে ব্যবহার করে মারপিট করিয়ে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছ। আর ওই হত্যা  মামলায় ১৪ আগস্ট রাতেই আটক দেখনো হয় বরখাস্ত তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর (প্রবেশন অফিসার) মুশফিকুর রহমান, শরীরচর্চা শিক্ষক ওমর ফারুক ও কারিগরি শিক্ষক শাহানুর আলমকে।
শনিবার দুপুরের প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন জানান, ১৯ জনকে  হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এই পাঁচজনের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশ সুপার জানান, প্রতিষ্ঠানের হেডক্লার্ক নুরুল ইসলাম বন্দি হৃদয়ের কাছে চুল কাটতে যায়। কিন্তু হৃদয় তার চুল কাটতে রাজি না হওয়ার কারণেই এ ঘটনার সূত্রপাত বলে প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। পরে নুরুল ইসলাম তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেন। একইসাথে হৃদয় ও আরেক বন্দি পাভেল সমকামিতা ও মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ আনেন তিনি। এসময় এসব কথা নাঈম নামের আরেক বন্দি শুনে হৃদয়ের কাছে বলে দেয়। হৃদয় জানার পর তার নেতৃত্বে আরও অনেকে ৩ আগস্ট নুরুলকে মারপিট করে। এ ঘটনার ১০ দিন পর ১৩ আগস্ট কর্তৃপক্ষ মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয় জড়িতদের শায়েস্তা করতে হবে। তারই ধারাবাহিকতায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বন্দিদের শনাক্ত করে প্রতিষ্ঠানের ডরমেটরিতে ডেকে এনে একে একে বেধড়ক মারপিট করা হয়।
এসময় প্রতিষ্ঠানের আরও সাত/আটজন পুরাতন বন্দি কর্তৃপক্ষের সাথে যুক্ত হয়ে নির্মমভাবে তাদেরকে মারপিট করে ফেলে রাখে। তাদেরকে চিকিৎসা সেবাও দেয়া হয়নি। এরমধ্যে একজন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এসময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে হাসপাতাল থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে পুলিশ সুপার নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান অন্তত ১২/১৩ জন বন্দি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে ডরমেটরিতে পড়ে আছে। পুলিশভ্যানে করে তাদেরকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মাঝে আরও দু’জনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ সুপার জানান, উপরিউক্ত ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে আরও নয়জনের সাথে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। পুলিশ সুপার আরো জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। জড়িতরা কেউই ছাড় পাবেনা। ব্রিফিংয়ের সময় আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ডিএসবি তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক সার্কেল গোলাম রব্বানী শেখ,  যশোর কোতোয়ালি অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ সৌনে দাশ ও যশোর কোতোয়ালির ইন্সপেক্টর ইনভেস্টিগেশন শেখ তাসমীম আলম।
তিনি আরও জানান, তদন্ত চলমান রয়েছে। ঘটনায় ওই পাঁচ কর্মকর্তা ছাড়াও সাত/আটজন বন্দি সংশ্লিষ্ট রয়েছে। সেব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।
এদিকে, এ ঘটনায় সমাজসেবা অধিদপ্তর গঠিত দু’সদস্যের তদন্ত কমিটি শনিবার থেকে কাজ শুরু করেছে। কমিটির সদস্যরা এদিন যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সাথে কথা বলেছেন। এরপর ঘটনাস্থল শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যান তারা। ওই কমিটিতে রয়েছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মোহাম্মাদ নুরুল বসির ও উপপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এস এম মাহমুদুল্লাহ।
এছাড়া, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি তদন্তে পাঁচ কর্মদিবস  সময় পেয়েছে। আজ থেকে এই কমিটি মাঠে নামবে। কমিটির প্রধান যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবুল লাইছ, সদস্য সচিব সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক অসিত কুমার সাহা এবং সদস্য এএসপি পদমর্যাদার পুলিশ সুপারের একজন প্রতিনিধি।
এদিকে, শনিবার এ  প্রতিবেদক মোবাইলে কথা বলেন নিহত পারভেজের বাবা রোকা মিয়া, নিহত নাইমের ভাই সাহাদৎ হোসেন ও নিহত রাসেলের ভগ্নিপতি হাবিবুর রহমানের সাথে। তারা জানান, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ভেতরে কোনো সংঘর্ষ হয়নি, কর্মকর্তারা যোগসাজসে তিন কিশোরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ‘খুনিদের’ কাঠোর শাস্তি দেখতে চান।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশু বন্দিদের ভালো হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে, সংশোধিত না করে উল্টো খুন করা হয়েছে। তারা তত্ত্বাবধায়ক মাসুদকে পাষন্ড আখ্যায়িত করে তিনিসহ তার সকল সহযোগীর ফাঁসি দাবি করেছেন।
এদিকে, শনিবার বিকেলে আটক পাঁচ কর্মকর্তাকে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহাদী হাসানের আদালতে উপস্থিত করা হলে আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চাঁচড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর রোকিবুজ্জামানের সাতদিনের রিমান্ড আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনজনের পাঁচদিন ও দু’জনের তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একইসাথে এ মামলার পাঁচজন সাক্ষীর জবানবন্দিও গ্রহণ করেছেন আদালত। এসব সাক্ষী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মচারী।
আদালত সূত্র জানায়, তত্ত্বাবধায়ক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, প্রবেশন অফিসার মাসুম বিল্লাহ, সাইকো সোস্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমানের পাঁচদিন এবং কারিগরি প্রশিক্ষক (ওয়েল্ডিং) ওমর ফারুক ও ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর শাহানুর আলমের দু’দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
এছাড়া, এদিন মামলার সাক্ষী তানভীর হোসেন, বাবুল হোসেন, মোসলেহ উদ্দিন, জাহাঙ্গীর আলম ও রকিবুল ইসলামের জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোর সদর উপজেলার পুলেরহাটে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় আহত করা হয় আরও ১৫ থেকে ১৭ জন বন্দি।




আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft