রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০
মতামত
যশোরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং
পাভেল চৌধুরী :
Published : Monday, 13 July, 2020 at 11:21 PM
যশোরে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবংডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন দু‘বছরের জন্য। ১৯০৮-১৯০৯ সালে। যশোরের আকাশ-বাতাস-মাটি শহীদুল্লাহ্র সংস্পর্ষ পেয়েছে, প্রত্যক্ষ সাহচর্য পেয়েছে ঐ সময়ের জেলা স্কুলের ছাত্ররা আর সহকর্মীরা। যশোরবাসীর জন্য বিষয়টা কম গর্বের না। যদিও জেলা স্কুলে শিক্ষকতা শহীদুল্লাহ্ সাহেব সাধ করে করেননি। আর্থিক সংকট তাঁকে এই চাকরী করতে বাধ্য করেছিল। এই আর্থিক সংকটের সাথে সংগ্রামে কেটেছিল তাঁর প্রথম জীবন কিন্তু এই সংকট তাঁর শ্রম আর প্রচেষ্টার বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, পারেনি তাঁর প্রতিভার প্রতিবন্ধক হতে। আপন লক্ষ্যে দুর্বিনীত মাঝির মত বিক্ষুদ্ধ সাগর পাড়ি দিয়ে তিনি তাঁর তরণি ভিড়িয়েছিলেন।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র জন্ম হয়েছিল ১৮৮৫ সালের ১০ই জুলাই। পশ্চিম বাংলার বশিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে। পিতা; মুন্সি মফিজউদ্দিন আহমদ, মা; হুরুন্নেসা। আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না পরিবারে কিন্তু জ্ঞান চর্চার প্রচলন ছিল। আরবি ফারসি উর্দু ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান তিনি পারিবারিক ভাবে অর্জন করেছিলেন। উত্তরকালে তিনি যে বিশ্বজনীন ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার পেছনে পারিবারিক এই শিক্ষার ভূমিকা ছিল বড় রকমের।
ছোটোবেলায় শহীদুল্লাহ্ যে স্কুল থেকে লেখাপড়া শিখেছিলেন সেই স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত ছাড়া আর কোনো ভাষা শেখার সুযোগ ছিল না। শহীদুুল্লাহ্কে বাধ্য হয়েই সংস্কৃত ভাষা শিখতে হয়েছিল আর এই শিখতে যেয়েই সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে তিনি বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। আরবি এবং সংস্কৃত ভিন্ন ধরণের ভাষা। শব্দ নির্মাণের প্রকরণও তাদের ভিন্ন। আরবিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বরধ্বনিগুলো পরিবর্তিত হয়ে শব্দান্তর ঘটায় এবং ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে কিন্তু সংস্কৃতে মূলত প্রত্যয় বা উপসর্গ যোগ করে শব্দান্তর ঘটান হয়। স্বরধ্বনির পরিবর্তন সেখানে মুখ্য না। ভাষার এই ভিন্ন চরিত্র ভাষা সম্পর্কে তাঁকে বিশেষ কৌতুহলি করে তোলে। উত্তরকালে তিনি বলেছেন যে, ছেলেবেলায় সবাই যখন মাঠে নানা ধরণের খেলায় মেতে থাকত তিনি তখন মাঠের খেলায় না মেতে ভাষার খেলায় মেতে উঠেছিলেন। তাঁর দক্ষতা ছিল; - বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, অবহট্ট, ফারসি, হিন্দুস্তানি, উর্দু, গ্রিক, লাতিন, হিব্রু, নেওয়ারি, তিব্বতি, বালুচি, পস্তু, সিন্ধি-গুজরাটি, মারাঠি, তামিল-মুন্ডা, প্রভৃতি ভাষায়।
১৯০৯-১০ সালে তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতিতে অনার্সসহ বি এ পাশ করেন। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতিতে এম এ ভর্তি হওয়ার সময় বিপত্তি বাঁধে। রক্ষণশীল অধ্যাপক সত্যব্রত সামশ্রয়ী বেঁকে বসেন। হুমকি দেন যে, কোনো ‘যবন’ সন্তানকে পবিত্র ভাষা সংস্কৃতিতে পড়ার জন্য এম এ ক্লাসে ভর্তি করা হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। এদিকে শহীদুল্লাহ্ও নাছোড়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তখন দুর্দম্য প্রতাপ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। কোনোভাবেই এই সমস্যার সমাধান করতে না পেরে তিনি একটা নতুন বিভাগ খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব’। শহীদুল্লাহ্ হলেন এই বিভাগের প্রথম ছাত্র, শুধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে না, সারা উপমহাদেশের মধ্যে প্রথম। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের মূল কথা হল ভাষার উৎসে যাওয়া। সাধারণত একটা মৌলিক ভাষা থেকে একাধিক ভাষার জšম হয়। কালক্রমে সেসব ভাষা থেকে আবার অনেক শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটে। এইসব ভাষা সমূহের মধ্যে যেমন মিল থাকে, অমিলও থাকে। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের কাজ  হল এইসব মিল অমিল বিষয়গুলোকে অনুধাবন করা এবং তার মূলের সন্ধান করা। ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী স্যার উইলিয়াম জোনস কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে এক বক্তৃতায় দেখান যে সংস্কৃত ভাষার সাথে গ্রীক লাতিন জার্মান ও কেলভিক ভাষা সমূহের সম্পর্ক রয়েছে। তারপর থেকেই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে ভাষাবিদদের বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি হয়।
১৯১১-১২ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে সসম্মানে দ্বিতীয় বিভাগে এম এ পাশ করেন। ১৯১৩ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় তিনি জার্মানিতে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভারত সরকারের বৃত্তি লাভ করেন। কিন্তু যে কোনো কারণে হোক তিনি সে বৃত্তি গ্রহণ করেননি।
১৯১৪ সালে তিনি বি এল পাশ করেন। দেখা যাচ্ছে ১৯১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে চাকরী করছেন। আবার ১৯১৫-১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ২৪ পরগণা জেলার বশিরহাটে আইনজীবী, স্থানীয় পৌরসভার ভাইসচেয়াম্যানও তিনি। এ পর্যন্ত তাঁকে যেন ঠিক চেনা যায় না। তাঁর লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কেও পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় না। যদিও নানা ধরণের সামাজিক কর্মকান্ডে তিনি তখন অংশগ্রহণ করছেন, পত্রিকার সাথে সম্পর্কিত হচ্ছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রবন্ধও লিখছেন। ‘কবির সাহেব ও হিন্দু ধর্ম’ নামে প্রবন্ধ লিখলেন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় (শ্রাবণ ১৩২৪), সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় লিখলেন ‘বাংলা শব্দকোষ সম্পর্কে আলোচনা’। এ রকম আরও কিছু তাত্ত্বিক ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে এই সময়কালে তিনি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (এপ্রিল ১৯১৮) লিখেছিলেন ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ নামে প্রবন্ধ।
এই সময় ১৯১৯ সালে, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বার্তা এল তাঁর কাছে। - তোমার জায়গা আইনজীবী সমিতি না, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগ দাও। সেই অনুযায়ী ঐ বছরই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের গবেষণা সহায়ক পদে যোগ দিলেন।
এতদিনে যেন নির্দিষ্ট পথ পেলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আর জ্ঞান চর্চার সেই বাঁধান সড়কে তাঁর দীর্ঘ জীবন তিনি পরিভ্রমণ করলেন নিবিষ্ট মনে।
১৯২১ সালের ২রা জুন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। উচ্চতর ডিগ্রির জন্য দু‘বছরের ছুটি নিয়ে তিনি ২রা সেপ্টেম্বর ১৯২৬ সালে প্যারিসে যান্। সেখানে সার্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক ভাষা, প্রাচীন পারসিক, তিব্বতি, বিভিন্ন ভারতীয় আধুনিক ভাষা, অধ্যায়ন ও গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ইউরোপের দু‘টি দেশ, ফ্রান্স আর জার্মানি, ইন্দো-আর্য-ভাষাতত্ত্বের উপর গবেষণার ক্ষেত্রে তখন অগ্রগণ্য। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম এশিয় যিনি ভাষাতত্ত্বের উপর ডিগ্রি অর্জন করেন। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থাতেই তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদিক, সংস্কৃত, ও প্রাকৃত ভাষা অধ্যায়ন করেন। এর ফলে ইউরোপের বিখ্যাত পণ্ডিতদের সংস্পর্ষে আসেন তিনি এবং তাঁেদর গবেষণা কর্ম সম্পর্কেও সম্যক অবহিত হওয়ার সুযোগ পান।

চলবে.....




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft