মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
লিবিয়ায় পাচারকারীদের গুলিতে নিহত রাকিবুলের পরিবারে শোকের মাতম
আবুল কাশেম, বাঁকড়া(ঝিকরগাছা)
Published : Saturday, 30 May, 2020 at 10:37 PM
লিবিয়ায় পাচারকারীদের গুলিতে নিহত রাকিবুলের পরিবারে শোকের মাতমছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন লিবিয়ায় খুন হওয়া রাকিবুল ইসলামের মা মাহিরুন নেছা। সেইসাথে বাবা, ভাইবোন আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিল বাতাস। জ্ঞান ফিরে এলেই মায়ের আকুতি, ‘আমাগের আর ছাঁদের বাড়ি করা লাগবে না, সংসারে আর স্বচ্ছ¡লতা ফিরানো লাগবে না। তুই ফিরে আই বাজান; ফিরে আই! আমার সোনারে আমার কাছে আনি দেন’।
রাকিবুলের মায়ের এমন বুকফাটা আহাজারিতে চোখের পানি সংবরণ করতে পারেনি তাদের বাড়িতে আসা শ’শ’ মানুষ। আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে অবিরাম কেঁদে চলেছেন তিনি।শান্তনা দেয়ারও যেন কেউ ছিলেন না। সুখের সন্ধ্যানে বিদেশ যেয়ে সেখানেই লাশ হবেন রাকিবুল তা কি কেউ কখনো ভেবেছিলেন!
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সাড়ে চার মাস আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের তরুণ রাকিবুল ইসলাম রকি (২০)। জমি বিক্রি আর এনজিও থেকে নেয়া ঋণের টাকা খরচ করে পিতা-মাতা ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বিদেশে। ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পাশাপাশি পরিবারের স্বচ্ছ¡লতার কথা ভেবেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তাকে বিদেশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু স্বপ্ন পূরণতো দূরের কথা; সন্তান আর সম্পত্তি হারিয়ে বাকরুদ্ধ ইসরাফিল হোসেন ও তার স্ত্রী মাহিরুন নেছা। দিশেহারা হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।
১৫ ফ্রেব্রæয়ারি লিবিয়ার ত্রিপোলির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন রাকিবুল। লিবিয়া প্রবাসী চাচাতো ভাই ফিরোজের মাধ্যমে যোগাযোগ হওয়া দালালের সাথে তাদের চুক্তি হয় সাড়ে চার লাখ টাকায়। বাংলাদেশ থেকে বাসে ভারতের কলকাতা, সেখান থেকে প্লেনে মুম্বাই, দুবাই, মিশর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজীতে পৌঁছান রাকিবুল। সেখানে তিনি দালালের ক্যাম্পে থাকতেন। ১৭/১৮ দিন সেখানে অবস্থান করলেও দালাল তাদেরকে ত্রিপোলি পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়। তখন রাকিবুল নিজে বেনগাজীতে কাজ খুঁজে নেন। এ অবস্থায় মে মাসে আব্দুল্লাহ নামে অপর এক দালালের সাথে পরিচয় হয় রাকিবুলের। এ দালাল তাকে ৭০ হাজার টাকা দিলে ত্রিপোলিতে পৌঁছে দেবে বলে জানিয়েছিল। আরও কয়েক জনসহ ত্রিপোলির উদ্দেশে রওনা হন রাকিবুল।
১৭ মে তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানান তার বড় ভাই সোহেল রানা। তিনি আরও জানান, ১৮ মে তার মোবাইল ফোনে ইমো অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বলা হয়, তার ভাইকে পেতে হলে ১২ হাজার ডলার পৌঁছে দিতে হবে দুবাইতে। না হলে তাকে মেরে ফেলা হবে। তারা লিবিয়ায় অবস্থানরত তাদের চাচাতো ভাই ফিরোজের সাথে যোগাযোগ করে টাকা দুবাইতে পৌঁছে দিতে চাইলে রাজি হয়নি অপহরণকারীরা।
‘প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে সোহেল রানাকে ফোন দেয়া হতো এবং নির্যাতিত রাকিবুলের সাথে কথা বলিয়ে দেয়া হতো। রাকিবুল তাদের বলতো, ‘আমার জীবন ভিক্ষা দে। তোরা টাকা ম্যানেজ করে দে। আমি বাড়ি এসে সারা জীবন তোদের গোলামী করে টাকা পরিশোধ করে দেব।’
বৃহষ্পতিবার গৃহযুদ্ধকবলিত দেশ লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে খুন করা হয়। তাদেরই একজন এই রাকিবুল ইসলাম রকি।
শনিবার (৩০ মে) দুপুরে রাকিবুলের নিজ বাড়ি ঝিকরগাছার শংকরপুর ইউনিয়নের খাটবাড়িয়া গ্রামে যেয়ে দেখা যায়, আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা ইসরাইল হোসেন ও মা মাহেনুর নেছা। তাদের আহাজারি যেন কিছুতেই থামছে না। এলাকার শ’শ’ নারী-পুরুষ ছুটে এসেছেন তাদের সান্তনা দেয়ার জন্য। চার ভাইবোনের মধ্যে রাকিবুল সবার ছোট। যে কারণে তার প্রতি অন্যদের আদরও বেশি। তার এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের খবরে বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে।
রাকিবুলের বড় ভাই সোহেল রানা বলেন, আগামী ১ জুন পর্যন্ত দালালদের কাছ থেকে সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছেন না। তার চাচাতো ভাই সকালে লিবিয়া থেকে ফোন করে জানিয়েছেন, যে ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তার মধ্যে রাকিবুলও রয়েছেন। সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। লাশ কবে দেশে আসবে, তাও জানি না।’
রাকিবুলের বাবা ইসরাইল হোসেন জানান, রাকিবুল যশোর সরকারি সিটি কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। লিবিয়া প্রবাসী চাচাতো ভাই এক বাংলাদেশি দালাল  আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে রাকিবুলকে লিবিয়ায় নিয়ে যান। চার মাস আগে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে রাকিবুলকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছ¡লতা ফেরানোর ইচ্ছা নিয়ে রাকিবুল বিদেশে পাড়ি জমান। লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে জিম্মি হওয়ার পরে মানব পাচারকারীদদের গুলিতে নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যেও রাকিবও আছেন।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, ভিটেবাড়ি বিক্রি করেও রাকিবের মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করা হয়েছিল। আগামী ১ জুন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে সময় নেয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যে পাচারকারীরা তাকে গুলিতে হত্যা করে। এখন সরকারের কাছে তাদের দাবি, দ্রæত আইনি প্রক্রিয়া শেষে সন্তানের মরদেহ বাড়িতে আনার ব্যবস্থা করা হোক।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft