শনিবার, ০৬ জুন, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
হাত পাততে না পারা মানুষের দুর্বিসহ অবস্থা
এম. আইউব :
Published : Wednesday, 8 April, 2020 at 8:06 PM
হাত পাততে না পারা মানুষের দুর্বিসহ অবস্থাকরোনাভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তারে দুশ্চিন্তায় পড়েছে ঘরবন্দি হাজার হাজার কর্মহীন মানুষ। বিশেষ করে অনুদান নেয়ার জন্যে যারা হাত পাততে পারেন না তাদের অবস্থা দিন দিন দুর্বিসহ হয়ে উঠছে। পরিবারের লোকজনদের নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়তে যাচ্ছেন তারা। ইতোমধ্যে অনেকেই সামনের দিনগুলো নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছেন। যশোরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে আলাপ করে তাদের এই অসহায়ের কথা জানাগেছে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করেছে। প্রথম অবস্থায় আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত এ ঘোষণা বলবত থাকবে। অবশ্য, বর্তমানে প্রতিদিনই করোনাভাইরাস যেভাবে বিস্তার লাভ করছে তাতে করে এই বন্ধের সময় দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে অনেকেরই ধারণা।
করোনার এই মহাদুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে সারাদেশের মানুষ বর্তমানে ঘরবন্দি। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বেশিরভাগ মানুষ ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। মানুষের কাছে এখন অর্থের চেয়ে জীবন বাঁচানো জরুরি হয়ে পড়েছে। এ কারণে না খেয়ে থাকলেও তারা বাইরে বের হচ্ছেন না। যদিও প্রাণ বাঁচাতে খাওয়াটাও জরুরি।
করোনার ভয়াবহ সংকটের মধ্যে সরকারিভাবে অসহায় দুঃস্থ মানুষকে কমবেশি খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও বিত্তবান মানুষ যার যার সাধ্যমতো অসহায় কর্মহীনদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এসব সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেন একেবারেই অসচ্ছল মানুষ। যশোরের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে তেমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
এসব অসচ্ছল মানুষ কমবেশি সাহায্য সহযোগিতা পেলেও বিপাকে রয়েছেন নি¤œবিত্ত মানুষ। যারা বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িত। যারা এতদিন ধরে অসচ্ছল মানুষকে কমবেশি সহযোগিতা করেছেন। আজ তারাই সহযোগিতা পাওয়ার অপেক্ষা করছেন! ভাগ্য বড়ই নির্মম।
যশোরে ছোটখাটো ব্যবসা, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন এমন মানুষের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেননি। কোনো দপ্তরে এর নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও নেই। কারণ প্রতিনিয়ত এই সংখ্যা কমবেশি হয়ে থাকে। তারপরও এই শ্রেণির মানুষের সাথে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাতে আনুমানিক দু’ লাখের মতো হতে পারে। এসব মানুষ পরিবারের প্রয়োজনে কারও কাছে হাত পাততে পারছে না। সামনের দিনগুলোতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ তারা সব সময় ফিটফাটে চলে এসেছেন। এখন তাদের আর্থিক কষ্টের বিষয়টি অনেকেই মানতে নারাজ। বিশেষ করে অনুদান বিতরণ করা জনপ্রতিনিধিরাতো মানতেই চাচ্ছেন না। ফলে, এই পর্যায়ের মানুষ কোনো অনুদান এখনও পর্যন্ত না পেলেও তারই বাড়ির পাশে একজন অসচ্ছল ব্যক্তি একাধিকবার পেয়েছেন।
কথা হয় জুতা-স্যান্ডেল বিক্রেতা মাসুম হোসেন, কসমেটিকসের দোকানি সাজ্জাদ, পার্টস ব্যবসায়ী রুহুল, আইনজীবী সহকারী বাবু, ফার্নিচার ব্যবসায়ী আলম, ফার্নিচার কারখানার শ্রমিক আশরাফ হোসেনসহ বিভিন্ন পেশার বেশ কয়েকজন মানুষের সাথে। তাদের কথাবার্তায় চরম হতাশা। এসব মানুষের অধিকাংশের বক্তব্য,‘সবকিছু বন্ধ। যা সঞ্চয় ছিল তা শেষের দিকে। অল্প সময়ের মধ্যে আর্থিক সংকট দেখা দিবে। সামনের দিনগুলো পরিবারের সদস্য নিয়ে কীভাবে চলবো তা জানিনা। সামনে অন্ধকার দেখছি।’ এ ধরনের হতাশা বিভিন্ন বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবীদের মধ্যেও। এসব প্রতিষ্ঠান যদি সংকটে পড়ে তাহলে তারা বেকার হয়ে পড়বেন। তখন কী হবে। এই শ্রেণির হাত পাততে না পারা মানুষ এখনও পর্যন্ত কোনো জায়গা থেকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাননি।
তাদের বক্তব্য,‘বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে যদি সাহায্য সহযোগিতা বিতরণ করা হয় তাহলে অনেকেই উপকৃত হবেন। এক্ষেত্রে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালিকা করে পৌঁছে দিলে পরিবার পরিজন নিয়ে কোনোভাবে চলতে পারবেন তারা।’
সরকারি এবং জনপ্রতিনিধিদের নিজ উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ নিয়েও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম চলছে। সরকারিভাবে দেয়া খাদ্য সহায়তা যেসব জনপ্রতিনিধিদের কাছে দেয়া হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা তাদের পছন্দের লোকদের মধ্যে তা বিতরণ করছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি বলে খবর মিলেছে। অধিকাংশ ইউনিয়নে চেয়ারম্যানদের সাথে মেম্বরদের সমন্বয় নেই। মেম্বরদের অভিযোগ, চেয়ারম্যানরা নানা ধরনের অনুদান তাদের মতো করে বন্টন করছেন। মেম্বরদের কাছে যা দিচ্ছেন তা হাস্যকর বলে দাবি তাদের। যদিও সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলীমুজ্জামান মিলন বলেছেন, মেম্বরদের কাছে কোনো খাদ্য সহায়তা দেয়ার কোনো বিধি নেই। সরকারি নির্দেশনা হচ্ছে, মেম্বররা তালিকা দিবেন। সেটি যাচাই বাছাই করে সরাসরি ভুক্তভোগী ব্যক্তির হাতে খাদ্য সহায়তা দিতে হবে। যে কারণে অনেক মেম্বরের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে।
বিভিন্ন ইউনিয়নের মেম্বরদের বক্তব্য, কোন ওয়ার্ডে কারা কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন সেটি মেম্বররাই ভালো জানেন। অথচ তাদের বাদ দিয়ে চেয়ারম্যানরা তাদের পছন্দের লোকদের দিয়ে বিতরণ করাচ্ছেন। ফলে, যারা বিতরণের দায়িত্ব পাচ্ছেন খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে তাদেরই আত্মীয় স্বজনদের। এ কারণে অনেক অসচ্ছল মানুষ খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর হাত পাততে না পারা মানুষরাতো বাদই থাকছেন।
করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে সামান্য খাদ্য সহায়তাও অনেক অসচ্ছল মানুষকে অন্ধকারে পথ দেখাচ্ছে। তারপরও সরকারিভাবে যে চাল দেয়া হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে তা খাবার অনুপযোগী বলে জানিয়েছেন গ্রহীতারা। অসচ্ছল মানুষের বক্তব্য,‘যা দেয়া হচ্ছে তা যেন তারা খেয়ে বাঁচতে পারেন। বাড়ি নিয়ে যাতে নষ্ট করতে না হয়।’ এসব অসচ্ছল মানুষ জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে যে চাল দেয়া হচ্ছে তা খুবই ভালো মানের। সেই চালে সন্তুষ্ট তারা।
খাদ্য সামগ্রী বিতরণ নিয়ে কথা হয় যশোর জেলা কৃষক লীগের সদস্য আলমগীর সিদ্দিকের সাথে। তিনি বলেন,‘সরকারি উদ্যোগে সমন্বিতভাবে তালিকা করে বিতরণ করলে যারা পাওয়ার উপযোগী তারা পাবেন। কেউ পাবেন কেউ পাবেন না তা হবে না।’
আরবপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর মহসীন সরদার বলেন,‘অনেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের পছন্দের লোকদের দিয়ে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করছেন। এ কারণে তাদের কাছের লোকেরাই এটি পাচ্ছে। অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। মেম্বররা ওয়ার্ডের বেশিরভাগ মানুষকে চেনেন। তাদের কাছ থেকে তালিকা নিলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।’
সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন,‘দলমত নির্বিশেষে গ্রামভিত্তিক কমিটি করতে হবে। সেই কমিটি যারা পাওয়ার উপযোগী তাদের তালিকা করবে। সেই তালিকা অনুযায়ী যেকোনো ধরনের সহায়তা বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিলে একদিকে করোনার ঝুঁকি কমবে অন্যদিকে যারা আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন অথচ হাত পাততে পারেন না তারাও পাবেন।’
এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের সাবেক একাধিকবারের চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম রন্টুর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন,‘এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। এই সময়ে জনপ্রতিনিধিদের পক্ষপাতমূলক কোনোকিছু করা উচিত না। মানবিক কারণে সকলকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা উচিত। এমনকি যাদের অর্থ আছে কিন্তু বর্তমানে কাজে লাগাতে পারছেন না তাদেরও সহযোগিতা করা উচিত।’  




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft