মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
খাবার পাচ্ছেন না যশোরে বস্তির হাজারও মানুষ (ভিডিও)
শিমুল ভূইয়া :
Published : Monday, 30 March, 2020 at 11:01 PM
খাবার পাচ্ছেন না যশোরে বস্তির হাজারও মানুষ (ভিডিও)করোনাভাইরাসের কারণে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ওদের জীবন। বস্তিবাসীর নেই পর্যাপ্ত মাস্ক, সাবান কিংবা গ্লোবস। করোনাভাইরাসের ভয়ের চেয়ে এখন বড় সমস্যা তাদের ঘরে খাবার নেই। চোখে এখন সর্ষে ফুল দেখছেন তারা।
যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকার বস্তি ঘুরে এ চিত্র উঠে এসেছে। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বস্তির অনেকেই তাদের এই দুর্দশার কথা বলেন।
রোববার দুপুরে কথা হয় শহরের ঘোপের বউবাজার এলাকার সিকদারের চাতাল এলাকার বাসিন্দা ৭০ বছরের ফজিলা খাতুনের সাথে। তিনি জানান, চার বছর আগে তার স্বামী মারা গেছেন। তার মেয়ে বাহাদুরপুর এলাকার একটি সুতার মিলে চাকরি করে সংসার চালান। এখন তাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে, না খেয়ে সময় কাটছে তার। কথা হয় হায়াতুন নেসা নামে আরেক বৃদ্ধার সাথে। তিনি চোখে দেখতে পাননা। স্বামী আবু তাহের দিনমজুর। এখন তার কোনো কাজ নেই। তাই বাড়িতে সময় কাটাতে হচ্ছে তাকে। একই বস্তির রহিমা বেগম জানান, দু’দিন আগে ভাত খেয়েছেন তিনি। তারপর থেকে আর চুলায় আগুন জ্বলেনি। কথা হয় স্বামীহারা চায়না, ভ্যানচালক রফিকুল, রিকশাচালক ইনতাজ মোল্লা,ইউনুস আলী, জোগালে রিনা খাতুন, ফাতেমা, রাজমিস্ত্রি রানা, ইজিবাইকচালক বিটুল, ভ্যানচালক রাজ্জাক, দিনমজুর ফারুক, রিকশাচালক বাবলু, কলমিস্ত্রি লতিফ, রাজমিস্ত্রি আফজাল, ইসমাইল, মনোয়ারের স্ত্রী বিউটি ও মৃত আজিমের স্ত্রী রশিদার সাথে। তাদের সকলেই এখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান।
সরেজমিন ঘোপ ডিআইজি রোডের বস্তির রুবেল, চায়না, তামান্না, কাকলী, রানা ও কুটির সাথে কথা বললে তারা বলেন, শুনেছি সরকার চাল দিচ্ছে কিন্তু তারা কেউই পাননি। সোমবার দুপুরে পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের মেঠোপুকুর পাড়বস্তি, ৩ নং কলোনি, নীলগঞ্জ বস্তিপট্টি, পূর্ববারান্দি মাঠপাড়া বস্তি ও মালোপাড়া বস্তি ঘুরে চোখে পড়ে বস্তিবাসীর অসহায়ত্বের দৃশ্য। করোনার ভয়াবহতা নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। বস্তিতে গাদাগাদি করে বসে থাকছেন অনেক লোক। একই ওয়ার্ডের কিলোক্যাম্প বস্তির অন্তত ১০ জন স্বামীহারা ও সন্তানহীন বৃদ্ধার সাথে কথা হয়। মৃত মঞ্জুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা বেগম, মৃত সররতির স্ত্রী সুফিয়া বেগম, মৃত মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম, মৃত আব্দুল মজিদের স্ত্রী মুন্নি বেগম, মৃত কালামের স্ত্রী ফিরোজা বেগম, মৃত সামসুর রহমানের স্ত্রী তাসলিমা, মৃত মুসা করিমের স্ত্রী শাহীনা খানমের সাথে কথা হয়। তারা অধিকাংশই পরের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। কেউ কেউ ভিক্ষা করেন। এখন তাদের আয়ের আর কোনো পথ নেই। এ কারণে না খেয়ে দিনপার করতে হচ্ছে তাদের। তারা বলেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাদের কিছুই দেননি। স্থানীয় মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর ভোটের সময় এসেছিলেন। এরপর আর কখনো আসেননি। একইদিন বিকেল চারটায় ৭ নং ওয়ার্ডের হারান কলোনির সামনে বসে ছিলেন ফেরিওয়ালা আজিজুল হক। তিনি জানান, চারদিন ধরেই বাড়িতে শোয়া। করোনার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে তিন হাজার টাকা আগে থেকেই জমিয়ে রেখেছিলেন। সেটা দিয়েই চলছে। শেষ হলে করোনা তাকে আর বাড়িতে আটকে রাখতে পারবেনা। জীবনের তাগিদে তাকে প্রয়োজনে ভিক্ষা করতে হবে! পাশে বসে থাকা বায়েজিত শেখ, দাউদ, জহুর, সেলিম, রিকশাচালক ইউনুচ আলী, রাজমিস্ত্রির জোগালে রিনা বেগম, ফাতেমা, রহিমও একই কথা বলেন। স্বামীহারা আম্বিয়া, নুরজাহান, বেবি, নবিবর, মৃত মোবারকের স্ত্রী জামেনাসহ সকলেই বড় অসহায়। এ অবস্থায় সহযোগিতা কামনা করেছেন বিত্তবানসহ সরকারি দপ্তরের। এছাড়া, আনসার ক্যাম্পের পাশের বস্তির জয়নাল সরদারের ছেলে বৃদ্ধ আলম সরদার জানান, চার বছর ধরে পঙ্গু হয়ে বাড়িতেই পড়ে আছেন। স্ত্রী অন্যের বাড়ি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এখন ওষুধ, খাবার কিছুই নেই। ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। ওই বস্তির রহিমা বেগম, হালিমন বিবি, শাহানারা বেগম, মান্নান, আলেয়া আনজু, রোকেয়া, জরিনা, সুন্দরী বেগম, রাজু, আব্দুস সাত্তারের বক্তব্য, এলাকার কেউই তাদের খোঁজ খবর রাখে না। কাউন্সিলর এর আগে বেশকিছু সহযোগিতা করেছিলেন। কিন্তু এবার তাদের পাশে কেউই নেই। এছাড়া, মিলপাড়া বস্তি, বারেকপট্টি বস্তি, নুরুল হক বস্তি, টিবি ক্লিনিক এলাকার অন্তত অর্ধশত বস্তিবাসীর সাথে কথা বললে তারা সকলেই অসহায় হয়ে সাহায্য প্রার্থনা করেন। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের বাসিন্দা স্বামীহারা আনোয়ারা বেগম জানান, ৪০ বছর ধরে তিনি ওই এলাকার আজিজ মোল্লার বাড়িতে বিনা ভাড়ায় বসবাস করেন। কারাগারের স্কুলের সামনে বসে বাদাম বিক্রি করে সংসার চলে তার। স্কুল বন্ধ। এ কারণে বন্ধ উপার্জনও। কিন্তু পেটতো তা মানেনা! তিনি জানান, ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছে তিনবার গিয়েছেন। কিন্তু কোনো সাহায্য পাননি। জেলরোড এলাকার আসলামের ক্ষোভ, তিনি একবার ওয়ার্ড কাউন্সিলর, একবার মহিলা কাউন্সিলর আর একবার বস্তি উন্নয়ন কমিটির কর্মকর্তাদের কাছে ছুটছেন। কিন্তু কোনো খাবার মিলছেনা।
এসব বিষয়ে ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম মোস্তফা বলেন, তার এলাকার মানুষ শহরের সবচেয়ে গরিব। ওই এলাকায় ১০ টি বস্তি রয়েছে। সেখানকার ৯০ ভাগ মানুষ দিন আনে দিন খায়। সরকারের তরফ থেকে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৫৫ প্যাকেট খাদ্য। যা পর্যাপ্ত না। একই অভিযোগ করেন ১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আহম্মেদ শাকিল, ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ রাশেদ আব্বাস রাজ, ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোকছিমুল বারী অপু ও ৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সন্তোষ কুমার দত্ত।
এসব বিষয়ে যশোর পৌরসভার সচিব আজমল হোসেন গ্রামের কাগজকে বলেন, তারা এক হাজার প্যাকেট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। যা সব কাউন্সিলরদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। আবার আসলে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, সরকার প্রাথমিকভাবে খাদ্য বিতরণের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া, এলাকার বিত্তবানদেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।




আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft