বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
আর্সেনিকের গ্রাম মাঝদিয়া
আক্রান্ত ১৬৭জন : মারা গেছেন ১১
টিপু সুলতান, কালীগঞ্জ :
Published : Saturday, 18 January, 2020 at 6:48 AM
আক্রান্ত ১৬৭জন : মারা গেছেন ১১ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ইউনিয়নের মাঝদিয়া গ্রামের শতভাগ নলকূপে আর্সেনিক রয়েছে বলে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে। এ গ্রামে প্রায় চার হাজার নারী পুরুষের বসবাস। এর মধ্যে আর্সেনিকোসিস রোগে আক্রান্তের সংখ্যা একশ ৬৭। ইতোমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত ১১জন মুত্যুবরণ করেছেন। যাদের মধ্যে সর্বশেষ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মারা যান মোক্তার আলী নামের একজন।
আর্সেনিক নিয়ে কাজ করা এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের রেকর্ডে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে, ২০০৩ সালের পর এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাদের দাবি আর্সেনিকে এ উপজেলায় কেউ মারা যায়নি।
মাঝদিয়া গ্রামে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করা হলেও তা মোট জনসংখ্যার অপ্রতুল। অনেক আগে এখানে আর্সেনিকমুক্ত প্লান্ট করা হলেও ব্যবহার না করায় বর্তমানে সেগুলোর অবস্থা নাজুক।
এদিকে, প্রায় ১০ বছর আগে মাঝদিয়া গ্রামে সরকারিভাবে স্থাপিত গভীর নলকূপের পানি পরীক্ষা করে আর্সেনিক পাওয়া যায়। যে কারণে গভীর নলকূপ স্থাপন করাও এখানে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নয় বলে সে সময় জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে সে সময় ওই গ্রামের একটি পুকুর থেকে পানি শোধন প্লান্ট স্থাপন করে একটি দাতা সংস্থা। যে প্লান্টের পানি এখনো গ্রামের মানুষ পান করছেন।
কালীগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, উপজেলার পৌর এলাকা ও ১১টি ইউনিয়নের দু’শ ৩০ গ্রামে ২৯ হাজার পাঁচশ ৬৩টি সচল টিউবওয়েল রয়েছে। যার মধ্যে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে দু’হাজার নয়শ ৫০টি টিউবওয়েলে। এর মধ্যে বারোবাজার ইউনিয়নে তিন হাজার চারশ ৪৩টি সচল টিউবওয়েলের মধ্যে নয়শ ৪৮টি উিবওয়েলে আর্সেনিক রয়েছে।
২০০৩ সালে করা ওই জরিপে উপজেলায় মাত্র ২৯জন আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে জামাল ইউনিয়নে একজন, মালিয়াটে দু’জন, বারোবাজারে ২৪ ও রাখালগাছি ইউনিয়নে দু’জন রোগী রয়েছে। এরপর আর কোনো তথ্য নেই খোদ সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে।
এদিকে শতভাগ আর্সেনিকযুক্ত মাঝদিয়া গ্রামে কত জনসংখ্যা, কতটি নলকূপ, এতে কী পরিমাণ আর্সেনিক এবং কতোজন রোগী আছে তার কোনো হিসেব নেই স্থানীয় উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পরিসংখ্যাণ অফিসে। তবে তারা জানায় বারোবাজার ইউনিয়নের নলকূপে ২৭ দশমিক ৩০ শতাংশ আর্সেনিক রয়েছে-যা উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই রিপোর্টটি ২০০৩ সালে তৈরি করা। শেষের ১৭ বছরের কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে।
বর্তমানে মাঝদিয়া গ্রামের আর্সেনিক নিয়ে কাজ করছেন এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের মাঠকর্মী আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জানান, গ্রামে একশ ৬৭জন আর্সেনিকোসিস রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে বেশি রোগী রয়েছেন গ্রামের ঘোষপাড়ায়। এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের এই কর্মীর দাবি, এই গ্রামে আর্সেনিক রোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ১১জন মারা গেছেন। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা যান মোক্তার আলী নামের একজন।
মাঝদিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা করে জানিয়েছে আমাদের গ্রামে একশভাগ নলকূপেই আর্সেনিক রয়েছে। এক সময় ভাবতাম, এখন আর ভাবি না। আমরাতো আর্সেনিকযুক্ত নলকূপের পানি খাচ্ছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে না’।
কালীগঞ্জ উপজেলা আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার সুলতান আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কাছে আর্সেনিকের কোনো তথ্য নেই। আর্সেনিকোসিস বিষক্রিয়ায় কেউ মারা গেছে কিনা এমন তথ্যও আমার জানা নেই। আমি দু’বছর হলো কালীগঞ্জ হাসপাতালে এসেছি’।
সঠিক তথ্য নিতে হলে হাসপাতালের পরিসংখ্যাণ অফিসার নাঈমুল হকের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এই ডাক্তার। কিন্তু গত দু’সপ্তাহ হলো কোনো তথ্য না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে যাচ্ছেন পরিসংখ্যাণ কর্মকর্তা। সর্বশেষ তিনি মুঠোফোনে জানান, ২০১৪ সালে দু’জন আর্সেনিকোসিস আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে এসেছিলেন। এরপর আর কোনো তথ্য নেই।
এব্যাপারে কালীগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী জেসমিন আরা জানান, ‘মাঝদিয়া গ্রামে শতভাগ নলকূপে আর্সেনিক আছে তা আমরা শুনেছি। তবে এর কোনো জরিপ রিপোর্ট আমাদের হাতে নেই। তাছাড়া এ নিয়ে কোনো বাজেট বা কার্যক্রম নেই। বেশ কয়েক বছর আগে সরকারিভাবে উপজেলায় মোট তিনশ ৭১টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। সে সময় মাঝদিয়া গ্রামে সাতটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল’।
ঝিনাইদহ শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের পূর্বদিকে কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ইউনিয়নে মাঝদিয়া গ্রাম। সুদীর্ঘকাল ধরে এ গ্রামের মানুষ একে অপরের সাথে মিলে মিশে বসবাস করে আসলেও তারা জানতো না ভয়াবহ বিষ আর্সেনিকের কথা। আর্সেনিকের লক্ষণ চর্মরোগ দেখা দেয়ার পর তারা স্থানীয় হোমিও ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতেন। প্রথম ১৯৯৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর চারটি নলকূপ পরীক্ষা করলে তাতে আর্সেনিক ধরা পড়ে। ১৯৯৯ সালে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা গরীবের আশ্রয় মাঝদিয়া গ্রামে পরীক্ষা করে একশ ২৩জন আর্সেনিক রোগী চিহ্নত করে। এর মধ্যে ইজ্জত আলী ও জয়দেব কুমার নামের দু’জন মারা গেছেন। সে সময় বেসরকারি সংস্থা গরীবের আশ্রয় দু’জন রোগীকে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
এরপর ওই গ্রামে আর্সেসিক নিয়ে কাজ করে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক, গরীবের আশ্রয়, পল্ল¬ী উন্নয়ন সংস্থা এবং ইউনিসেফ। তাদের দেয়া তথ্যে মাঝদিয়া গ্রামে প্রায় তিনশটি নলকূপ রয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ শতাংশ নলকূপের প্রতি লিটার পানিতে আর্সেনিক রয়েছে শূন্য দশমিক সাত মিলিগ্রাম-যা সহনীয় মাত্রার (শূন্য দশমিক পাঁচ মিলিগ্রাম) চেয়ে ১৫ গুণ বেশি। ৬০ শতাংশ নলকূপের প্রতি লিটার পানিতে আর্সেনিক রয়েছে শূন্য দশমিক পাঁচ মিলিগ্রাম যা স্বাভাবিক সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এছাড়া অন্য ৩৫ শতাংশ নলকূপেও কমবেশি আর্সেনিক রয়েছে যা গ্রামবাসীর জন্যে ভয়ানক। তবে, বর্তমানে এ গ্রামে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা সুপেয় পানি নিয়ে কাজ করছে না।
বেসরকারি সংস্থা গরীবের আশ্রয়ের নির্বাহী পরিচালক জামাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় মাঝদিয়া গ্রামে আমরা নয়টি আর্সেনিক ও আইরন রিমোভাল পানির প্ল¬ান্ট তৈরি করেছিলাম। এখন আমাদের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে’।
পল্লী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আতাউল হক জিহাদ বলেন, বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় মাঝদিয়া গ্রামে তিনটি আর্সেনিক ও আইরন রিমোভাল পানির প্ল্যান্ট এবং সাতটি ডিপ টিউবওয়েল তৈরি করা হয়েছে।  



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft