শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরে ভবনসহ ৩০ বিঘা জমি সন্ত্রাসীদের দখলে
কাগজ সংবাদ :
Published : Sunday, 27 October, 2019 at 6:42 AM
যশোরে ভবনসহ ৩০ বিঘা জমি সন্ত্রাসীদের দখলেসদর উপজেলার হামিদপুর গ্রামে যশোরের দু’জন স্বনামধন্য ব্যক্তির আনুমানিক ৩০ বিঘা জমি সন্ত্রাসী কায়দায় দখল করে রেখেছে একটি চক্র। আছাদুজ্জামান নামে একব্যক্তির নেতৃত্বে তার সন্ত্রাসী ছেলেরা এ জমি দখল করেছে। কেবল দখল করেনি; ইতোমধ্যে পাকা প্রাচীর নির্মাণ করে সেখানে চাষাবাদ করছে। হামিদপুর বাওড়ের একটি বড় অংশ আছাদুজ্জামান ও তার ছেলেরা জোরপূর্বক দু’টি পুকুর খনন ও বাঁধ নির্মাণ করে বেশ কয়েক বছর ধরে অর্থ উপার্জন করে চলেছে। তারা গায়ের জোরে বাওড়ের সরকারি জমিও নিজেদের দখলে নিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদেশে সার্ভেয়ার সরেজমিন তদন্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেন। এই প্রতিবেদনে  দেখা যায় আশির দশকের প্রথম দিকে নুরুল ইসলাম, মিসেস শামসুন নাহার ইসলাম ও নূর  মোহাম্মদের স্ত্রী মিসেস রহমান শামীম ২.৯৭ একর জমির ওপর তৎকালীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের অর্থায়নে একটি হাঁসের খামার গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে চালু হওয়ার পর বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত মহয়ে যায়। এবংএই ঘূর্ণি ঝড়ের আগে ওই প্রকল্পে একটি বড় ধরনের ডাকাতি হয়। এ সময় প্রকল্পের এমডি নুরুল ইসলাম মারাত্মকভাবে আহত হন। তার একটি হাত কয়েক টুকরো হয়ে যায়। তাকে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। এ ঘটনার পর নুরুল ইসলাম শিল্প ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থপনা পরিচালক (এমডি) ডক্টর মহিউদ্দীন খান আলমগীরের সাথে দেখা করে সার্বিক চিত্র তুলে ধরে বলেন প্রকল্পটি তার পক্ষে আর চালানো সম্ভর না। এ অবস্থায় তিনি জানান যে, প্রকল্পভুক্ত ২.৯৭ একর জমিসহ পরিচালকবৃন্দের ব্যক্তিগত সমস্ত জমিজমার কাগজপত্র  বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করবেন এই শর্তে যে  ব্যাংক  সুদসহ প্রদত্ত মূল ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করে তাকে এবং পরিচালকবৃন্দকে দায়মুক্ত করবে। এই আবেদন ব্যাংকের এমডি গ্রহণ করে প্রস্তাবিত যাবতীয় দলিলাদি ব্যাংকের ঝিনাইদহ শাখায় জমা যশোরে ভবনসহ ৩০ বিঘা জমি সন্ত্রাসীদের দখলেদিতে বলেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অধস্তনদের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের কিছুদিনের মধ্যে  মহিউদ্দীন খান আলমগীর অন্যত্র বদলি হয়ে যান। একই সাথে প্রক্রিয়াটিও বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক ১৯৯৩ সালে প্রকল্পভুক্ত ২.৯৭ একর জমি সার্টিফিকেট অফিসারের মাধ্যমে প্রথম নিলাম ডাকে। এই নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে আছাদুজ্জামান ২.৯৭ একর জমির মালিক হন। ব্যাংক দ্বিতীয়বার নিলাম ডাকে। নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায় জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০.১৮৮০ একর। এই নিলামে আছাদুজ্জামানও অংশ নেন। কিন্তু তিনি নিলাম পাননি। নিলামটি পান জনৈক সবুর। কিন্তু এই নিলাম বিজ্ঞপ্তিটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ ও বেআইনি। দ্বিতীয় নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে নুর মোহাম্মদের ব্যক্তিগত জমিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এ কারণে মামলা চলে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত। আপিল বিভাগ দ্বিতীয় নিলামটি খারিজ করে দেয়। একইসাথে আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে  ‘যেহেতু নুর মোহাম্মদ জেস ডাক (প্রাঃ) লিমিটেড নামে উল্লেখিত প্রকল্পটির পরিচালক বা শেয়ার হোল্ডার নন, সেহেতু এ সম্পত্তি একান্তই তার নিজের।’ আপিল বিভাগ মূল রায়টি সরাসরি যশোর সদর সার্টিফিকেট অফিসারের কাছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাসহ পাঠিয়ে দেন।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় আপিলটি বাতিলের পরপরই জেস ডাক (প্রাঃ) লিমিটেডের এমডি নুরুল ইসলাম ও নুর মোহাম্মদ সাবেক শিল্প ব্যাংক ও বর্তমানে বিডিবিএল নামে পরিচিত ব্যাংকটির এমডির সাথে দেখা করেন। নুরুল ইসলাম প্রস্তাব রাখেন, জেস ডাক (প্রাঃ) লিমিটেড সুদ মওকুফ সাপেক্ষে মূল ঋণ পরিশোধ করতে প্রস্তুত আছে। তিনি এও জানান যে, সুপ্রিম কোর্টের রায় বের হওয়ার অনেক আগে থেকেই আছাদুজ্জামান ও তার দু’ ছেলে পরিচালকবৃন্দের ব্যক্তিগত সম্পত্তি যা এখনও ব্যাংকের আওতায় রয়েছে তা নিজেদের দখলে রেখেছে। ওই সময় ব্যাংকের এমডি বলেন, সম্পূর্ণ সুদ মওকুফের বিষয়টি সর্বোচ্চ সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করা হবে। আপনারা আগে মূল ঋণ পরিশোধ করেন। মূল ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টাকা। ব্যাংকের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের ভিত্তিতে পরিচালকবৃন্দ নিজ নিজ ঋণের অংশ সমন্বয় করে ঋণের উক্ত ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন এবং জানাগেছে যে, ব্যাংকের সঙ্গে জেস ডাক (প্রাঃ) লিমিটেডের দায়দেনা সংক্রান্ত বিষয়টি অতিদ্রুত নিষ্পন্ন হবে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়টি সরাসরি সার্টিফিকেট অফিসারের কাছে পৌঁছানোর পর মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতির উপর শুনানি শুরু হয়। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ব্যাংকে পরিশোধ করা ২০ লাখ টাকার কাগজপত্র জমা দেয়া হয় এবং বাকি সমস্যা সমাধানের পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়।
এছাড়া, নুর মোহাম্মদের আবেদনের ভিত্তিতে সার্ভেয়ার সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন “১.০৬ একর জমি আবেদনকারী নুর মোহাম্মদ পিতা মো. আব্দুল মালেক, সাং দৌলতপুর এর নামে আরএস রেকর্ড চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কেবল তাই না, আছাদুজ্জামান পিতা মৃত শহিদ উদ্দিন  আহমেদ, সাং হামিদপুর ওই জমিতে পাকা প্রাচীর দিয়ে ভোগদখল করছেন।” ভোগদখলের বিষয়ে আছাদুজ্জামান সার্ভেয়ারকে জানান, তিনি নিলাম ক্রয়ের মাধ্যমে এসব সম্পত্তি প্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু সার্ভেয়ার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে দেখেন আছাদুজ্জামান মাত্র ২.৯৭ একর জমি নিলামে কিনেছেন। যা পরবর্তীতে খাস খতিয়ানভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে আছাদুজ্জামানের কোনো সম্পত্তি সেখানে নেই।
সর্বশেষ গত ২৬ আগস্ট সার্টিফিকেট অফিসার তার রায়ে লিখেছেন, ‘১ম নিলামের তফসিলভুক্ত জমি ২য় নিলামে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ১ম নিলাম ক্রয়কারীকে আদালত ইতোমধ্যে তফসিলভুক্ত ২.৯৭ একর জমি সরেজমিনে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ১ম নিলামের তফসিলভুক্ত জমি ব্যতীত উক্ত নিলাম ক্রেতার অন্য জমি দখলে রাখার আইনত সুযোগ নেই। পক্ষভুক্ত নুর মোহাম্মদের জমি ১.০৬ একর এ মামলাধীন নিলামের তফসিলভুক্ত নয়।’     
যশোরের দু’জন সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্বনামধন্য ব্যক্তি মাস্টার নুরুল ইসলাম ও নুর মোহাম্মদ হামিদপুরে বসবাস না করার সুযোগে বিস্তীর্ণ ওই সম্পত্তির দিকে কুনজর পড়ে আছাদুজ্জামান ও তার সন্ত্রাসী ছেলেদের। আছাদুজ্জামান হামিদপুর বাওড়ের ২.৯৭ একর জমি নিলামে ক্রয় করেন। যা ভূমি অফিসের তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি আছাদুজ্জামান।
তার ছেলেরা এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। কিছুদিন আগে তার এক ছেলে আরমান পুকুরে মাছ চুরির মিথ্যা অপবাদে শাহ আলম নামে এক কৃষককে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ মামলায় তপু নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। কেবল তাই না, আছাদুজ্জামানের আরেক ছেলে আফরাও পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। পুলিশের সাথে গুলি বিনিময়ে তার পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। বর্তমানে পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে। হামিদপুর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এই পরিবারকে ভূমিদস্যু বলে আখ্যায়িত করেছে। তারা তাদের কবল থেকে যশোরের স্বনামধন্য মাস্টার নুরুল ইসলাম ও নুর মোহাম্মদের জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়েছে।   




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft