রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০
সারাদেশ
দখলদারদের প্রভাবে বিলুপ্তির পথে কলাপাড়ায় আদিবাসী রাখাইন পাড়া
এইচ,এম, হুমায়ুনকবির কলাপাড়া(পটুয়াখালী) :
Published : Tuesday, 17 September, 2019 at 3:16 PM
দখলদারদের প্রভাবে বিলুপ্তির পথে কলাপাড়ায় আদিবাসী রাখাইন পাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রভাবশালী মহল, ভুমিদস্যুরা দখল করে নিচ্ছে আদিবাসী রাখাইন পাড়া। রাখাইনদের উপসনালয়, প্যাগোডা, দামী মুর্তি ও সংখ্যালঘু রাখাইন পরিবারগুলোর ফসলি জমিসহ বসতভিটা। রাখাইনদের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রভাবশালীদের মামলাদায়ের ও ভুমি দস্যুদের কালোদাবায় অনেক পরিবার ইতোমধ্যে পাড়ি জমিয়েছে মিয়ানমারে। রাখাইনরা বন জঙ্গল পরিস্কার করে হিং¯্র জীবজন্তুর সাথে লড়াই করে বসতি স্থাপন করে। ভিন্ন জাতি ভিন্ন ধর্মেও ঐতিহ্য নিয়ে বাঙ্গালী পরিবারের সাথে মিশে আছে যুগ যুগ ধরে। উপকুলের বিপন্ন পরিবেশ থেকে প্রায় দু’শ বছর আগে উপজাতি রাখাইনরা বাংলাদেশে এসে ছিলো বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা মাথায় নিয়ে। এখানে ছিল নিঝুম বনাঞ্চল। বনে হিং¯্র জন্তর সাথে ও তাদের লড়াই করতে হয়েছে-ঝড় বন্যার তান্ডব। ঝড়ে বসতি উড়িয়ে নিয়েছে। আবার নতুন স্বপ্নে বুকে বেঁধেছে তারা। তবুও ঠাই নেই। রাখাইনদের জীবন চলছে ধুঁকে ধুঁকে।  
রাখাইন সুত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্টিগুলোর মধ্যে একটি জাতি রাখাইন। পালি ‘আরাখা’ (রক্ষ, রক্ষিত, রক্ষক) শব্দ থেকে রাখাইন শব্দটির উৎপতি। আর্য বংশোদ্ভুত রাখাইনদের প্রাচীন বাসস্থান চিল মগধ রাজ্য। পরে মগধ থেকে আরাকানে এসে স্থাপতি স্থাপন করে। পরিচিতি পায় মগধী বা মগ নামে।
মুস্তফা মজিদ সম্পাদিত আদিবাসী রাখাইন নামক গ্রন্থে জানা যায়, খ্রিষ্টপুর্ব ২৬৬৬ থেকে ১৭৮৪ খ্রিষ্টব্দে পর্যন্ত আরাকান ছিল একটি স্বাধীন ও স্বার্বভেীম রাজ্য। তারা এ রাজ্য বহুকাল রাজত্ব করত। তন্মাধ্যে চন্দ্র বংশ (৭৮৮Ñ৯৯৪) ও ¤্রাউ বংশ (১৪৩০-১৭৮৪) অন্যতম। ¤্রাউ রাজবংশের শেষ স¤্রাট থামাদা (১৭৮২Ñ১৭৮৪) যখন আরাকানের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন তখন  বর্মী শাসক বোধপায়া(১৭৮২Ñ১৮১৯) এই ক্ষুদ্র রাজ্যটিকে দখল করার জন্য এক পরিকল্পনা গ্রহন করেন। সে কারনে বোধপায়া ৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান রাজ্যটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আরাকানের অধিবাসীগন বর্মী শক্্রদের তখন বাধাদেয়। তখন আরাকানারী বর্মীদের নিকট পরাজিত হন। আর স¤্রাট থামাদা বর্মীদের হাতে বন্দী হয়ে প্রানদন্ডে দন্ডিত হন। তখন বর্মীদের অত্যাচারে আরাকানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গোলযোগ জন জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। এ সময় (১৭৮৫Ñ১৮২৫) ১৫০টি আরাকান পরিবার ৫০টি নৌকায় যোগে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বরগুনা জেলার তালতলী ,পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া, গলাচিপা উপজেলার থানার রাঙ্গাবালী দ্বীপে এসে উপস্থিতি হয় এবং বন জঙ্গল কেটে বসবাস করতে শুরু করে। পরবর্তীতে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে এ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করে এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলা উল্লেখযোগ্য।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে ১৭৮৪ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত বৃটিশ শাসনামলে এদের অনেকেই আরাকান থেকে বাংলাদেশে এসে উপকুলীয় জেলা বরগুনা জেলার তালতলী, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা, গলাচিপা উপজেলার রাঙ্গাবালীতে ২৩৭টি পাড়ায় ৫০ হাজারোর বেশি রাখাইন জনগোষ্টি ছিল। ১৯০০ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ১৬৮টি পাড়ায় ৫,১৯০টি বাড়ীতে প্রায় ৩৫ হাজার রাখাইন ছিল। ১৯৪৫ সালের জরিপে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় রাখাইন এর সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার আর পাড়ার সংখ্যা ছিল ২২০টির ও বেশি। কলাপাড়া উপজেলায় ১৯৭০-১৯৭১সালের জরিপ অনুযায়ী রাখাইন এর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার আর পাড়ার সংখ্যা ছিল ২৮টি। ১৯৯০-৯১সালের জরিপে এদের সংখ্যা ছিল ৫২৮২ জন আর পাড়ার সংখ্যা ছিল ২৮টি। ২০০০-২০০১ সালের জরিপে এদের সংখ্যা ছিল ১৫৬০ জন আর পাড়ার সংখ্যা হল ২৮টি। এখন কলাপাড়া উপজেলা রাখাইন পরিবারের সংখ্যা ৩২৫টি। বর্তমানে নিজস্ব জীবন ধরন পদ্ধতি , জমিÑজমা হারিয়ে এ জনপদ ছেড়ে বার্মা চলে যাচ্ছে পটুয়াখালীর অধিকাংশ অধিবাসীর রাখাইন। এক সময়ে রাজকীয় জীবন ধারায় অভ্যস্ত প্রত্যেকটি পরিবারে ছিল অটোল কৃষিজমি । রাখাইনদের প্রধান পেশা ছিল তাঁতশিল্প ও কৃষি। কিন্তু এখন ৯০ শতাংশই জমি-জমা হারিয়ে নিঃস্ব ও ভুমিহীন হওয়ার কারনে পাল্টে গেছে এ জনগোষ্টির পেশা। সুদৃশ্য টোংপাতা সারিবদ্ধ ঘর রাখাইন পরিবারের আবাসস্তল। আধুনিক কালের ইমারতের তৈরি ঘরের সাথে এ ঘর গুলোর সমপুর্ন বেমানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক রাখাইন পরিবার কিছু ভুমিদস্যুর দখলদারিত্বের ও অসাধু প্রভাবশালী মহলের চক্রান্তের শিকার হয়ে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে চলে যাওয়ায় আজ এ ঘরগুলো অবস্তা বিলুপ্তি প্রায়। রাখাইন পরিবারের দু একটা ঘর পুরানো ঐতিহ্যেও নীরব স্বাক্ষী হয়ে একদিন হয়তো পড়ে থাকবে। এই রাখাইন পল্লীতে। অধিবাসী রাখাইন জাতীকে প্রতি নিয়ত উচ্ছেত, আতঙ্ক, হুমকিÑধামকি আর প্রভাব শালীদের নানা শর্ত পুরন করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে। আশি দশকে ও অনেক পরিবারের জমি জমা ছিল, সংসারের সুখ শান্তি ছিল। সে সব জমি জমা এরা বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। অভাবেরর তাড়নায় ব›দ্ধক রেখে পরে সে জমি উদ্ধার হয়নি। জাল দলিল করে প্রভাবশালীরা জমি দখল করে নিয়েছে। কলাপাড়ায় জালিয়াত চক্রের দৌরাত্ব্যের কারনে গত ২৬.৮.২০১৯ রোজ রোববার বেলা ১১টায় উপজেলার বালিয়াতলী ইউনিয়নের সোনাপাড়া বয়োবৃদ্ধা মাজাফ্রু রাখাইন ৫০ বছরের ভোগ দখলীয় জমির রোপন করা আমন চারা আব্দুর রহিম ওরফে কাড রহিম ১৫-২০ লাঠিয়াল নিয়ে হামলা চালিয়ে জমির রোপন করা চারা উপড়ে ফের রোপনের কাজ শুরু করে। এসময় মাজাফ্রু নিজে মেয়েসহ ছেলে বউকে নিয়ে বাধা নিষেধ করায় তাদেরকে মারধর করা হয়। কাদার মধ্যে চেপে ধরা হয়। গায়ের ওড়না গলায় পেচিয়ে ধরা হয়। সোনাপাড়ার মৌজার এসএ ২৬৯ নম্বর খতিয়ানের তিন একর ২৪ শতক জমিতে দখলের চেষ্টা চালায় রহিম গং। মাজাফ্রু জানান, তার স্বামীর জীবদ্দশায় এসব জমি নির্বিঘেœ চাষাবাদ করে আসছেন। বর্তমানে আমার রাখাইন এ পরিবারটি আছেন চরম আতঙ্কের মধ্যে।
লতাচাপলী ইউনিয়নের কারাচানপাড়ায় রাখাইনদের সবচেয়ে বড় শ্নশান রয়েছে। ওই শ্নশানের চারদিকে দখল করে তোলা হযেছে বাড়ীÑঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এমনকি শ্নশান ঘেঁষে ল্যাটিন করা হয়েছে। এখন শ্নশানটি খুঁজে পাওয়া মুশকিল । রাখাইনদের কেউ প্রয়াত হলে সৎকার পর্যন্ত করা যায় না। মৎস্য বন্দর আলীপুরের কালাচানপাড়ার রাখাইন পল্লীর ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুরে এখন আর পদ্ম ফুল ফোটেনা, নেই স্বচ্ছ টলমলে পানি। এখন পুকুরটিতে ভাসছে বর্জ্য পলিথিন আর ময়লা আর্বজনা। আলীপুর বন্দরে পশ্চিম দিকে তাকালেই চোখে পড়তো এ পুকুরের শত শত ফোটা পদ্ম ফুল। বর্তমানে এ সরকারি খাস পুকুরের পূর্বপার দখল করে বহুতল মার্কেট নির্মান করায় ঐতিহ্যবাহী পদ্ম পুকুর টি এখন কারো দেখার উপায় টুকুও নেই। পাড়ার রাখাইনরা পুকুরের পানি ব্যবহার করতো খাওয়াসহ রান্নার কাজে। এ পুকুরে নেমে গোসল করা ছিল রীতিমতো গর্হিত কাজ। হাত- পা ধুতে হতো পানি উপরে তুলে। কালাচানপাড়ায় রাখাইনদের সংখ্যা কমে বর্তমানে ২৬টি পরিবার বসবস করছে। রাখাইনদের একাধিক লোক জানান, হানিফ মেম্বর, হাফিন মাওলানা , ইউসুফ হাজী ,জাফর হাজী ,খলিল পুকুরের পাড় দখল করে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করে। নাচনাপাড়া এবং চইয়াপাড়ার নামটি পাল্টে রাখা হয়েছে উলামানগর। টানিয়ে দেয়া হয়েছে একটি সাইন বোর্ড। সেখানকার দোকান গুলোর সাইন বোর্ডে এখন ও লেখা আছে নাচনাপাড়া। সেখানকার বেরিবাঁধের বাইরে রাখাইনদের শ্নশানের সামনে এবং আশপাশের জমি দখল করে স’মিল বাড়ী ঘর করা হয়েছে। এখনও বন বিভাগের ছইলা-কেওড়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে স্বাক্ষীর মতো। চর ধুলাসার গ্রামে এখন ও রাখাইনদের সমাধিস্থল এবং শ্নশান দৃশ্যমান। কিভাবে শ্নশান এবং পাড়ার জায়গা মালিকানা বদলে গেছে তা রহস্য উদঘাটন করা কঠিন। তবে অনুসদ্ধানে জানা গেছে, ভুমি অফিসের কর্মীদের যোগসাজশে লুজ খতিয়ান খুলে এসব জমির মালিকানা পাল্টে দেয়া হয়েছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি কমিউনিটি সিরিজ পটুয়াখালী জেলার বইয়ের ৭৫ নম্বর পৃষ্টায় এখনও গ্রামটির নাম লেখা রয়েছে হুইচ্যানপাড়া। তখনকার তথ্যমতে গ্রামটিতে মোট ১০৫টি পরিবারের বসবাস ছিল। লোক সংখ্যা ছিল ৬০০। অথচ এখন গ্রামটির নাম করা হয়েচে হোসেনপাড়া। কবে, কারা কিভাবে এমন কাজটি করেছে তা কেউ বলতে পারছেনা। লতাচাপলী মৌজার ২৬১নং খতিয়ানের ৫৪১৯দাগের জমি ভুমি অফিসের মুল রেকর্ড বইয়ে এখনও দেবালয় লেখা রয়েছে বৌদ্ধবিহার । ৫৪৮১নং দাগে লেখা রয়েছে ইন্দিরা (কুয়া)। অথ্যাৎ খাবার ও ব্যবহারের পানির জন্য পাড়ার রাখাইনরা কুয়া খনন করেছিল। এখানে মোট ২৫ শতক জমি রয়েছে। মুল মালিক ছিলেন ক্রাউনসে মগসহ অন্যরা। কিন্তু জালিয়াতচক্র বৌদ্ধবিহার ও ইন্দ্রিরার ওই জমিসহ সব রেকর্ড সংশোধন করে দেয়। ১৯৭৫ সালের ১৪ অক্টোবর এ অপকর্মটি করা হয়েছে। বয়োবৃদ্ধ রাখাইনরা জানান, ক্রাউনসে মগ ১৯৪৮ সালে দেশ ত্যাগ করেন। কিভাবে ১৯৭৫ সালে তার নামের রেকর্ডীয় জমি মুসলমানদের নামে চলে গেছে  এমন প্রশ্ন রাখাইনদের। উপজেলা ভুমি অফিসের বইয়ে ৬৩৬৩ নম্বও দাগের জমি এখন ও রাখাইনপাড়া ও বাড়ী লেখা রয়েছে। অথচ ওই জমি ও ভুয়া কাজগপত্রের মাধ্যমে দখল করে নেয়া হয়েছে। ভুমিদস্যুর দখলদারিত্বের ও জালিয়াতি এবং অসাধু প্রভাবশালী মহলের চক্রান্তের শিকার হয়ে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে চলে যাওয়া এভাবে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।       
বাংলাদেশ আদিবাসী রাখাইন ফোরামের নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী রাখাইন মেইনথীন প্রমীলা জানান,স্থানীয় প্রশাসনের উচিত সংখ্যালঘুদের জমি বেদখল হচ্ছে তার সহযোগিতা চাই। এ ধরনের ভুমি বেখল দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তাই স্থানীয় প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।  
কলাপাড়া উপজেলা (ভারপ্রাপ্ত) নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ কুমার দাশ বলেন, আমার কাছে রাখাইনদের জমি দখলের এভাবে কোনো লিখিত অভিযোগ আসলে তার ব্যবস্থা নেয়া হবে।  



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft