শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
ভয়াবহ ই-সিগারেটে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা
যশোরের ভিআইপি মার্কেটে প্রকাশ্যে বিক্রি
দেওয়ান মোর্শেদ আলম :
Published : Sunday, 1 September, 2019 at 8:49 PM
ভয়াবহ ই-সিগারেটে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরাভয়ানক ক্ষতিকর ই সিগারেটে ঝুঁকছে যশোরাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে ভেপিং পদ্ধতির এই ইলেক্ট্রনিক সিগারেট কেনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বন্ধুদের মধ্যে। স্কুল কিংবা কলেজ ছুটির পরপরই যশোরের ভিআইপি কয়েকটি মার্কেটের নির্দিষ্ট কিছু দোকানে জমছে শিক্ষার্থীদের ভিড়। আর কিনছে সিগারেটের বিকল্প হিসেবে খ্যাত ‘ইলেক্ট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম’ (এন্ডস) বা ‘ইলেকক্ট্রনিক সিগারেট।
যশোরে বিকিকিনি হওয়া দুই হাজার থেকে থেকে ছয় হাজার টাকা মূল্যের ওই যন্ত্রটির সুইচ টিপলেই উষ্ণ হয় দ্রবণ। তৈরি হয় বাষ্প, তখন নল দিয়ে টান দিলেই মুখভর্তি ধোঁয়া। ধুমপায়ীদের নয়া এই অস্ত্র এখন শিক্ষার্থীদের হাতে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসকেরা এই বস্তুটি ব্যবহার করা থেকে বারবার সতর্ক করলেও বিকিকিনি বন্ধ হচ্ছে না। যন্ত্রটি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলার অশনি সংকেত দিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
যশোরের কয়েকজন ডাক্তারের বক্তব্য নেয়া হলে তারা জানান, অবশ্যই ই-সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকির। এ ব্যাপারে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সতর্ক দৃষ্টি ছাড়াও বিকিকিনি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নজরদারি করতে হবে।
যশোরের একাধিক ই-সিগারেট ব্যবহারকারী ও বিকিকিনি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাধারণত সিগারেটের বিকল্প হিসেবে ‘ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম’ (এন্ডস) বা ‘ইলেকক্ট্রনিক সিগারেট’ ব্যবহার করা হয়। সিগারেটের মতই দেখতে ফাইবার বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই ব্যাটারিচালিত যন্ত্রটির একটি প্রকোষ্ঠ থাকে। তার মধ্যে ভরা থাকে বিশেষ ধরনের তরল মিশ্রণ। যন্ত্রটি গরম হয়ে ওই তরলের বাষ্পীভবন ঘটায় এবং ব্যবহারকারী সেই বাষ্প টেনে নেয় ফুসফুসে, যা ধূমপানের অনুভূতি দেয়। এই পদ্ধতিকে ভেপিংও বলে। তারা বিজ্ঞাপনে দেখেছেন ই-সিগারেট ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে সাহায্য করে।
তবে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও বিকিকিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি উড়িয়ে দিয়ে ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে তার কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এর প্রভাব সাধারণ সিগারেটের চেয়েও ক্ষতিকর বলে দাবি করছেন তাঁরা। এছাড়া এটি চরম আসক্তিতে এগিয়ে নিয়ে যায়। তারা জানাচ্ছেন, ই-সিগারেটের তরল মিশ্রণ (ই-লিকুইড)-এর মধ্যে থাকে প্রপেলিন পলিইথিলিন গাইসল, নানাবিধ ফ্লেভার এবং নিকোটিন। গরম হওয়ার সাথে সাথে এই রাসায়নিক গুলি থেকে সাধারণ সিগারেটের ধোঁয়ার সমপরিমাণ ফরমালডিহাইড উৎপন্ন হয়। এ ছাড়াও ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে অতিসূক্ষ রাসায়নিক কণা, যা ভীষণ ক্ষতিকারক। এর থেকে গলা, মুখ জ্বালা, বমিভাব এবং ক্রনিক কাঁশি দেখা দিতে পারে। ই-সিগারেটে নিকোটিন রয়েছে। আর এই নিকোটিনে আসক্তি তৈরি করে। গর্ভস্থ ভ্রুণ ও শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতি হয়। ইএনডিএস থেকে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ বা হার্টের রোগের আশংকা বাড়ে। এমনকী ম্যালিগন্যান্ট টিউমার তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে নিকোটিনের প্রভাব রয়েছে। কিছু কিছু ইএনডিএস-এ ব্যবহৃত রাসায়নিকে তৈরি হওয়া এরোসলে মিলেছে ফর্মালডিহাইড, সীসা, ক্রোমিয়াম, নিকেলের মতো শরীরের পক্ষে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর সব উপাদান।
কিন্তু সম্প্রতি যশোরাঞ্চলে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে এই ইলেক্ট্রনিক সিগারেট। শহরের জেস টাওয়ার,  সিটিপ্লাজা, ফেনসি মার্কেট, বড় বাজার ছাড়াও শহরের বিভিন্ন মোড়ের টিভি-মোবাইলের দোকান, হার্ডওয়ার ও বিভিন্ন ভার্সনের শো রুম, বেল্ট ও চশমার দোকানে বিক্রি হচ্ছে ই-সিগারেট যন্ত্রটি।
যশোর জিলা স্কুল, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, সরকারি এম এম কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, আব্দুর রাজ্জাক কলেজসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ওইসব দোকানে। শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়ায় উদ্বিঘœ হয়ে পড়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষকেরা। সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে শিক্ষার্থীদের ই-সিগারেট বিমুখ করা জরুরি বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
এ ব্যাপারে যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাক্তার ফতে আলী হাসান গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, অবশ্যই ই-সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকির। এতে নিকোটিন রয়েছে। কাজেই এই যন্ত্রটি পরিহার করা উচিৎ। আর শিক্ষাথীদের এ যন্ত্র থেকে দূরে থাকা উচিৎ। মনে রাখতে হবে ইলেক্ট্রিক সিগারেটের ফ্লেবার তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক মানব দেহের ধ্বমনী শিরা হৃদপিন্ডে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এটা ভ্যাপ লিথিয়াম ব্যাটারির মাধ্যমে চলে। এতে নিকোটিন থাকে যার বিশেষ স্বাদ ও গন্ধ মিশ্রিত প্রফেলিং গ্লাইসোল নামে রাসায়নিক পুড়িয়ে মস্তিস্কে ধূমপানের অনুভূতি সৃষ্টি করে। নিঃসন্দেহে এই ই-সিগারেটে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। আর শিক্ষার্থীরা এটা ব্যবহার করছে-তথ্যটি আঁতকে ওঠার মত।
প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, ছাত্ররা এই ই-সিগারেটে ঝুঁকে পড়ছে যা ভয়ানক ব্যাপার। যশোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এটা কিনছে, ব্যবহার করছে এমনটি চোখেও পড়ছে। এ ব্যাপারে এখনই কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এ ব্যাপারে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন বিকিকিনি দোকানের উপর প্রশাসনের নজরদারি চালাতে হবে।
ভারতের ক্যানসার চিকিৎসক এবং ভয়েস অফ টোব্যাকো ভিকটিমের সক্রিয় সদস্য সোমনাথ সরকার জানিয়েছেন, ই-সিগারেটের প্রধান উপকরণ নিকোটিন থেকে দ্রুত আসক্তি তৈরি হয়। সিগারেট ছাড়তে চেয়ে যারা এটি ব্যবহার করেন তাদের এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা থেকে দেখা দিতে পারে ফুসফুসের বিভিন্ন অসুখ।
এছাড়া, জাপানের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে দশ গুণ বেশি ক্ষতিকারক। আকর্ষণীয় এ যন্ত্রটি ব্যাটারিচালিত।
এদিকে, ২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের তরফে বিশ্বব্যাপী টোবাকো এপিডেমিক’ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্ট অনুসারে ৩০টি দেশে ইতিমধ্যেই ইএনডিএস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ আরও অনেক দেশ রয়েছে তালিকায়।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft