শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
শিক্ষা বার্তা
বই নেই, ক্লাস হয় না, তারপরও পরীক্ষা!
যশোরে শিকার ১ লাখ ২৬ হাজার শিশু
এম. আইউব :
Published : Sunday, 1 September, 2019 at 8:49 PM
বই নেই, ক্লাস হয় না, তারপরও পরীক্ষা!কোনো বই নেই। সারা বছর কোনো ক্লাসও হয় না। তারপরও নিয়মিত পরীক্ষা হচ্ছে! আর এ কারণেই বিব্রত লাখ লাখ শিশু শিক্ষার্থী। সাথে তাদের অভিভাবকরাও। এ ঘটনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে।
যশোরে এই পরিস্থিতির শিকার ১ লাখ ২৬ হাজার শিশু। সারা বছর ক্লাস না হওয়ায় অধিকাংশ শিশু তিনটি বিষয়ের ওই পরীক্ষায় অংশ নিতে অনাগ্রহী। শিক্ষকদের চাপে এসব শিশু শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও কী পরীক্ষা দেয় তা ঠিকমতো বলতে পারে না। অভিভাবকরাও থাকেন অন্ধকারের মধ্যে। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না।
কয়েকজন প্রধান শিক্ষক এই কারিকুলামকে ‘উদ্ভট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। একজন প্রধান শিক্ষক বলেছেন, শিক্ষক নির্দেশিকা দেখে যে ধারণা দেয়া হয় তা কোনো কাজে আসে না। আবার সব শিক্ষকের মান সমান না। এ কারণে তাদের অনেকে ধারণাও দিতে পারেন না বলে একজন প্রধান শিক্ষক উল্লেখ করেছেন। আর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ‘সরকারি কারিকুলাম এ রকম। তাদের কিছুই করার নেই।’
অনুসন্ধানে জানাগেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে নয়টি বিষয়ের পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। বিষয়গুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, চারু, কারু, শারীরিক শিক্ষা ও সঙ্গীত। সরকারি কারিকুলাম অনুযায়ী, পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় বাংলায় ১০০, ইংরেজিতে ১০০, গণিতে ১০০, পরিবেশ পরিচিতিতে ৫০, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় ৫০, চারুতে ২৫, কারুতে ২৫, শারীরিক শিক্ষায় ২৫ এবং সঙ্গীতে ২৫ নম্বরের। অথচ বিদ্যালয় থেকে সরকারিভাবে কেবলমাত্র বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বই সরবরাহ করা হয়। সারা বছর ক্লাস হয় এই তিনটি বিষয়ের উপর। অন্য কোনো বই দেয়া হয় না। এমনকি বাকি ছয়টি বিষয়ের তেমন কোনো বই বাজারেও মেলে না। যা দুই একটি পাওয়া যায় তা অধিকাংশ অভিভাবক কেনেন না বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন। আবার, উল্লেখিত নয়টি বিষয়ের পরীক্ষা দেয়াও বাধ্যতামূলক।  ফলে, কোনো কিছু না পড়েই পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করতে হচ্ছে শিশুদের। যদিও শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষক নির্দেশিকায় গাইডলাইন দেয়া রয়েছে। সেই অনুযায়ী ক্লাসে শিশুদের পড়ানোর কথা।
যশোরের বিভিন্ন স্কুলের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, ওই ছয়টি বিষয়ের পড়া সম্পর্কে শিক্ষকরা তাদের কোনো ক্লাস নেন না। কেবলমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। পরীক্ষার সময় শিক্ষকরাই বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর বলে দেন। তাদের বলে দেয়া উত্তর কেবল শিক্ষার্থীরা লিখে থাকে। শিক্ষকরা বলছেন, যেখানে কোনো বই নেই, সেখানে ক্লাস নেয়া না নেয়া একই কথা। কারণ শিশুদের বাড়িতে পড়া দিলে তারা তা কীভাবে পড়বে! এ কারণে কোনো পড়া দেয়া বা নেয়া হয় না। তবে, নির্দেশিকা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা করা হয় বলে দাবি তাদের। যেসব শিক্ষক এ সংক্রান্ত বক্তব্য দিয়েছেন তারা কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি। ‘সরকারি ব্যাপার। নাম বলে আমরা বেকায়দায় পড়তে চাই না।’ এ ধরনের বক্তব্য তাদের। কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, তাদের সন্তানরা সারা বছর না পড়েই ছয়টি বিষয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রথম এবং দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সামনে অনুষ্ঠিত হবে বার্ষিক পরীক্ষা। সেখানেও ক্লাস না করে পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে অবুঝ শিশুদের।
যশোরের আট উপজেলায় সর্বমোট ১ হাজার ২শ’ ৮৯ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪২ জন শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছে। এরমধ্যে প্রথম শ্রেণিতে ৬৩ হাজার ৮শ’ ৭০ জন ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৬২ হাজার ৫শ’ ৯৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
সাবিনা ইয়াসমিন নামে একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা তুলে দেয়ার পক্ষে; সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের কোনো বই নেই, ক্লাস হয় না, তারপরও পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। যা সুবিচার নয়। অবিলম্বে এ ধরনের কারিকুলাম ঠিক করা উচিত।
এসব বিষয়ে কথা হয় শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের সাথে। তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি যশোর জেলার সভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, যেখানে কোনো বই নেই। সেখানে পরীক্ষা গ্রহণ করাটা অমূলক। তাছাড়া, আগে প্রশ্নপত্রের একটি হার্ডকপি দেয়া হতো শিক্ষার্থীদের হাতে। বর্তমানে সেটিও দেয়া হচ্ছে না।
সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, কিছু সংকট রয়েছে। যেমন সঙ্গীতের শিক্ষক নেই কোনো স্কুলে। আগামী বছর এ পদে শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়োগ হলে সংকট কেটে যাবে। তবে, চারু-কারুর ক্লাস হয় বলে তিনি দাবি করেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেন, আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা না থাকলেও যাচাইয়ের পদ্ধতি থাকতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন হয়ে জেনে নিতে হবে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো জানাবেন। শিক্ষক নির্দেশিকা অনুযায়ী শিশুদের শেখানোর নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। সেই অনুযায়ী চলছে। এটি কারিকুলামের ব্যাপার। এখানে তাদের কিছুই করার নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।  



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft