অর্থকড়ি
চালের বাজারের লাগাম টানতে চরম ব্যর্থতা
এম. আইউব :
Published : Wednesday, 13 September, 2017 at 12:26 AM
চালের বাজারের লাগাম টানতে চরম ব্যর্থতাসারাদেশে চালের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে প্রশাসন। বিশেষ করে খুলনা বিভাগে এই অবস্থা সবচেয়ে প্রকট। এ অঞ্চলে গত এক মাসের মধ্যে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে পাঁচ থেকে আট টাকা। যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। চালের দাম নিয়ে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের মধ্যে। তারপরও চালকল মালিকরা বলছেন, আমন ধান না ওঠা পর্যন্ত চালের বাজারে স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা কম।
খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় গত এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে আট টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে দাম বেড়েছে গরীব মানুষের খাবার মোটা চালের। এ চালের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ছয়-সাত টাকা পর্যন্ত। বার বার চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বাজারে গেলে কখনও কখনও এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে বাকবিতন্ডা এক প্রকার লেগেই থাকছে।
সরেজমিন বাজার ও আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকদিন আগে যে মোটা চাল ৩৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে বর্তমানে তা ৪৬-৪৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪৬/৪৭ টাকার বিআর-২৮ চাল ৫০-৫২ টাকায়, ৫০/৫১ টাকার মিনিকেট ৫৩/৫৪টাকায়, ৫৮/৫৯ টাকার বাসমতি ৬২/৬৩ টাকায় বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। অন্যান্য চালের দামও একইভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দোকানীরা জানিয়েছেন। তবে, খুচরা দোকানে উল্লেখিত চালের দর আরো বেশি।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, যশোরের বাজারে যে পরিমাণ চালের চাহিদা রয়েছে তার চেয়ে যোগান কমে গেছে। কারণ হিসেবে মিল মালিকরা ঠিকমতো চাল সরবরাহ করতে পারছেন না বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে, দাম বৃদ্ধিতে মিল মালিকদের হাত রয়েছে বলে কোনো কোনো ব্যবসায়ীর অভিযোগ।
ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সরকার আমদানি শুল্ক হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশে আনে। এ কারণে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও আশার আলো দেখতে শুরু করে। তারা মনে করেছিল, চালের ‘গরমভাব’ কেটে যাবে। কিন্তু শেষ অবধি তা হয়নি। বরং এক মাসের ব্যবধানে ফের আগুন লেগেছে চালের বাজারে।  
এ প্রসঙ্গে যশোর বড় বাজারের অন্যতম চাল ব্যবসায়ী মেসার্স পিংকি স্টোরের মালিক সুশীল বিশ্বাস বলেন, আমদানি শুল্ক কমানোর কারণে চালের দাম কমার কথা। সেখানে দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ সম্পর্কে লোকমান নামে একজন ব্যবসায়ী বলেন, সরকার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। অধীর অধিকারী নামে আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন,  চালের দাম বেড়েছে। বেশি দামে কিনছি, বেশি দামে বিক্রি করছি। এর বেশি বলতে পারবো না।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, যশোরের বাজারে যে চাল পাওয়া যায় তার বেশিরভাগ আসে যশোরের শহরতলী মুড়লী এলাকার এরিস্টো ফুড, নওয়াপাড়ার মজুমদার ফুড, পদ্মবিলার ইলা ফুড, শার্শার জনতা অটো রাইচ মিল, শালিখার আড়পাড়ার এসবি অটো রাইচ মিল, খাজুরার সজীব অটো রাইচ মিল, পুড়োপাড়ার পদ্মা অটো রাইচ মিল, শার্শার মামা-ভাগ্নে অটো রাইচ মিল ও কুষ্টিয়ার বিশ্বাস অটো রাইচ মিলসহ অন্যান্য মিল থেকে। এর বাইরে যশোরের সলুয়া বাজার, খাজুরা বাজার, পুড়োপাড়া, মহেশপুর, চাড়াভিটা, বাঘারপাড়া ও ঝিকরগাছা থেকেও চাল আসে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
খুলনা বিভাগে চালের সর্বশেষ বাজার দর সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হয় দেশের অন্যতম প্রধান চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে। কথা হয় কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীনের সাথে। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় মোট ৫শ’র মতো চালকল রয়েছে। এরমধ্যে ৪শ’ হাস্কিং মিল, ৬০টি প্রোসেসিং মিল ও ৩১টি অটোমেটিক মিল আছে। জয়নাল আবেদীনের দাবি, গত এক মাসের মধ্যে ধানের দাম মণে ১শ’৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে চালের দামও বেড়েছে।
দফায় দফায় চালের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এবার মৌসুমের শুরুতেই কৃষক তুলনামূলক কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হয়। ওই অবস্থায় ধান বিক্রি করে দেয় তারা। ভালোভাবে শুকনো না হলে কোনো ধান মজুদ করা যায় না। চালের ক্ষেত্রেও তাই। ফলে, ধান কিংবা চাল মজুদের অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন।
চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, দাম কমানোর বিষয়টি একেবারেই সরকারের হাতে। সরকারের বিভিন্ন উইং রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করে সংকট নিরসণ করতে পারে।
কথা হয় বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ চাল ব্যবসায়ী বাংলাদেশ হাস্কিং এ্যান্ড অটো মেজর রাইচ মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের সাথে। তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ সরকারের। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভুল সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছে। ভরা মৌসুমে ডিউটি ফ্রি করে ভারত থেকে চাল আমদানি করে কৃষককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে কয়েক বছর আগে থেকে। তার রেশ চলছে। বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কৃষক ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে জানান আব্দুর রশিদ।
তার দাবি, কৃষক আগের মতো চাষ না করার কারণে চাহিদা অনুযায়ী ধান উৎপাদন হচ্ছে না। এ কারণে সরকার ভারত থেকে চাল আমদানি করছে। ফলে, চালের দাম ঊর্ধ্বমুখি হয়েছে। আমন ধান না ওঠা পর্যন্ত এ অবস্থার উত্তোরণ হবে বলে তিনি মনে করেন না।
যশোরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সব মিল ও বাজার থেকে চাল আসে শহরের সোনালী স্টোর নামে একটি আড়তে। সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা চাল কিনে বিক্রি করেন।
সোনালী স্টোরের একটি সূত্র জানায়, তাদের আড়ত থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৭ শ’ থেকে ১৮ শ’ বস্তা (২৫ কেজি ওজনের) বিভিন্ন প্রকারের চাল বিক্রি হয়ে থাকে। সোনালী স্টোর থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা চাল কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করে থাকেন।
সোনালী স্টোরের মালিক রফিকুল ইসলাম চৌধুরী মুল্লুক চাঁদ সাংবাদিকদের বলেন, আমার ব্যবসার বয়স ৩০ বছরের বেশি। এমন অবস্থা কোনোদিন দেখিনি। মিল মালিকরা চাহিদা মতো চাল সরবরাহ করতে পারছেন না। আর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে খাপছাড়াভাবে।
এদিকে, চালের বাজারে আগুন লাগার কারণে মাঠে নেমেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। গত কয়েকদিন ধরে কুষ্টিয়া এলাকার বিভিন্ন চালকলে হানা দিচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার চালকল পরিদর্শন করেন কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভীর রহমান। এ ব্যাপারে জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার রিং দিলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
যশোরাঞ্চলের চালকলগুলোতে কোনো প্রশাসনিক তদারকি হচ্ছে কি না জানতে ফোন করা হয় যশোর জেলা খাদ্য কর্মকর্তা নকিব সাদ সাইফুল ইসলামের কাছে। তিনি বলেন, যশোরে সাড়ে চারশ’র মতো চালকল রয়েছে। সবগুলো দেখাতো আর সম্ভব না। কোনো অভিযোগ আসলে সেখানে যাওয়া হবে।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft