শিক্ষা বার্তা
এমপিও বাতিল হবে : হয় কোচিং, নয় চাকরি ছাড়তে হবে
কোচিংবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি কার্যক্রম
দেওয়ান মোর্শেদ আলম :
Published : Thursday, 7 September, 2017 at 12:47 AM
কোচিংবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি কার্যক্রম আর রেহাই পাবে না কোচিংবাজরা। যশোর-খুলনাঞ্চলের শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবস্থাপনায় গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলোকে ঘিরে সাঁড়াশি কার্যক্রম শুরু করেছে শিক্ষা অধিদপ্তর। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষিত নীতিমালার আলোকে কোচিংবাজ শিক্ষকদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কোচিংয়ের সাথে জড়িত এমপিও ভূক্ত শিক্ষকদের এমপিও বাতিল করা হবে। ইতিমধ্যে বিধিমালা বাস্তবায়নের জন্য বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।
নীতিমালা ঘোষণার পর তা জেনেও না মানা শিক্ষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে খুলনা বিভাগের কোচিংবাজ শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারগুলোর চালচিত্র চলে আসবে শিক্ষা অধিদপ্তরে। এছাড়া ছাত্র-অভিভাবকদের জিম্মি করা অপ্রতিরোধ্য শিক্ষকদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স স্টাইলে কাজ শুরু করবে অধিদপ্তর। হয় কোচিংবাজ শিক্ষকদের কোচিং ছাড়তে হবে, নতুবা চাকরি ছাড়তে হবে।
এ ব্যাপারে দ্রুতই খুলনা বিভাগের প্রতি জেলা ও উপজেলায় কোচিং বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হবে বলে জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক প্রফেসর এটিএম জাকির হোসেন।
শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, দেশের সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোচিং পরিচালনা করে আসছে। এরমধ্যে নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, ¯œাতক, ও ¯œাতোকোত্তর, দাখিল, আলিম, ফাজিল, এমনকি কারিগরি মাধ্যমের শিক্ষকরাও রয়েছেন। আর যশোরে এ পরিস্থিতি এখন এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কোচিং বাণিজ্যে লিপ্ত শিক্ষকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। যা শিক্ষার্থী পরিবারের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। ওই সব শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগী না হয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় ব্যয় করছেন। এতে করে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ নিয়ে ২০১১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশনও দাখিল করা হয়। হাইকোর্টের আদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের উপর কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালে একটি পরিপত্র জারি করে। যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা ২০১২ বলে অবহিত করা হয়। আর এই নীতিমালা সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছেও পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর এই নীতিমালা ঘোষিত হলেও কার্যত তা তোয়াক্কা না করে খুলনা বিভাগের সব জেলাতেই অপ্রতিরোধ্য স্টাইলে চলছে কোচিং বাণিজ্য। কোচিং বাজদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর শিশু শিক্ষার্থীরাও। অনেকটা বাধ্য হয়ে শিশুদের কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন অভিভাবকরা। বছরের পর বছর নীতিমালা উপেক্ষা করে অনেক সরকারি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক চালাচ্ছেন কোচিং সেন্টার। কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। এমনকি শিক্ষকেরা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারেও পড়াতে পারবেন না। তবে দিনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। আর সরকার-নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ কোচিং করানো যাবে। তবে এজন্য কাউকে বাধ্য করা যাবে না।
কিন্তু নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক শিক্ষক নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এসবের ভয়াবহতা আঁচ করে চলতি বছরের জুলাই মাসে জোরেসোরে মাঠে নামে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চল। জুলাই ও আগস্টে প্রতি জেলায় জেলায় শুরু হয় কোচিং বাণিজ্য বিরোধী সভা সেমিনার মাইকিং এবং স্পট অভিযান। কিন্তু কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষক সিন্ডিকেট নানাভাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক সেল্টার নিয়েও কেউ কেউ এই কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার ধৃষ্ঠতা দেখানো শুরু করে। বিষয়টি জিরো টলারেন্স হিসেবে নিয়ে ঈদুল আযহার ছুটির পর সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা দেন শিক্ষা অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক।
শিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, কাউকে আর ছাড় নয়, গত পাঁচ বছর ধরে অসাধু শিক্ষকরা নীতিমালা তোয়াক্কা না করে পকেট ভরতে ব্যস্ত ছিল। এটা আর হতে দেয়া যাবে না। ইতিমধ্যে বিভাগীয় শহরে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি ও শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ পরিচালককে সদস্য সচিব করে মনিটরিং কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটিতে ৯ সদস্য রাখা হয়েছে। আর জেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষা ও উন্নয়নকে সভাপতি ও জেলা শিক্ষা অফিসারকে সদস্য সচিব করে কমিটি করা হয়েছে। আর উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে সদস্য সচিব করে মনিটরিং কমিটি করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কোচিং সেন্টারগুলোর সাথে জড়িত শিক্ষকদের হালনাগাদ তালিকা ও কোচিংয়ের তথ্য চেয়ে ইতিমধ্যে চিঠি দেয়া হয়েছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওইসব তথ্য চলে আসছে জেলা শিক্ষা অফিসে। কোচিংয়ে জড়িত শিক্ষকদের প্রাথমিক তালিকা ও চালচিত্র তৈরী করে একটি রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে। আসন্ন কোচিং বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর শিক্ষা অধিদপ্তর। এর আওতায় এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার এমপিও বাতিল করা হতে পারে। স্থগিত করা হতে পারে বেতন-ভাতা, এছাড়া বরখাস্তও করা হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের এমপিওবিহীন কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্য করলে তার প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতনভাতাদি স্থগিত করা হবে। এছাড়া তাকেও বরখাস্ত করা হতে পারে।
সূত্র আরো জানায়, এসব নীতিমালা সবচেয়ে বেশি যশোরে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। যশোরে এমপিওভূক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা বিভিন্ন নামে কোচিং খুলে অন্য লোকের নামে পরিচালনা করাচ্ছেন। এসব বাণিজিক কোচিং সেন্টারগুলো মূলতঃ তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট, এসএসসির শিক্ষার্থী, আর পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। খোদ শিক্ষকের নামেই যশোরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার।
শিক্ষা অফিসের একটি সূত্র জানিয়েছে, এগুলোর মধ্যে জোরেসোরে নাম শোনা যাচ্ছে পুলিশ লাইন স্কুল এলাকায় কামরুল (পুলিশ লাইনের শিক্ষক), বাদশা ফয়সালের সামাদ হোসেন নিরালা সিনেমা হল এলাকায় নিজ বাসায়, এমএসটিপি বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) একেএম মোকলেচুর রহমান কোচিং, অধ্যক্ষ আরিফুজ্জমানের ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ অনেকগুলোর নাম। বাণিজ্যিক কোচিং নিষিদ্ধ হলেও খোদ সরকারি বেসরকারি বিদ্যালয়ের ভবন ভাড়া করে গড়ে তোলা হয়েছে কোচিং সেন্টার। এছাড়া অনেক শিক্ষক নিজেরা কোচিং সেন্টার না খুলে বাইরের কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা অনেকটা বাধ্য হয়ে কোচিংয়ের দিকে ছুটছে। শ্রেণীকক্ষ থেকে শিক্ষকরা কোচিংয়ে যেতে ছাত্রছাত্রীদের প্ররোচিত করছেন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অলিখিত নির্দেশও দিচ্ছেন। কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাসে দিচ্ছেন চরম ফাঁকি। ক্লাসে শুধু সময় টুকু কাটাচ্ছেন মাত্র। নিজের নিকট আত্মীয়কে কোচিং সেন্টারের পরিচালক বা মালিক সাজিয়ে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা পকেটস্থ করছেন অনেক শিক্ষক। তারা নানা ছলচাতুরি আর চালাকি করে চলেছেন।   
এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক প্রফেসর এটিএম জাকির হোসেন গ্রামের কাগজকে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে যশোরেই বেশি কোচিং পরিচালিত হচ্ছে। বিশাল শক্তিশালী সিন্ডিকেট করে কতিপয় অসাধু শিক্ষক কোচিং সেন্টার খুলে গলাকাটা অর্থবাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছেন। ওইসব চক্রকে আর সময় দেয়া হবে না। দীর্ঘ পাঁচ বছর তারা নীতিমালার বাইরে চলেছে। এখন চলবে কোচিং বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান।
মিডিয়াকে পাশে পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে একটি আইন হচ্ছে, যার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়েছে। বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে চলবে এবারের কোচিংবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযান। আর তা দ্রুতই। ইতিমধ্যে কয়েকটি জেলায় সভা করা হয়েছে, সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও চলছে কোচিং। নীতিমালা বাস্তবায়নে শিক্ষা অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স থাকবে।
যশোর জেলা শিক্ষা অফিসার আমিনুল ইসলাম টুকু গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে আরও জোরালো অভিযান শুরু হচ্ছে। আর এটা কোচিংবাজ শিক্ষকদের জন্য অশনী সংকেত বলাও যেতে পারে। আর সুযোগ দেয়া হবে না। নীতিমালা বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে জেলা ও উপজেলার কোচিং সেন্টার ও জড়িত শিক্ষকদের চালচিত্র চাওয়া হয়েছে।  আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার সার্বিক চিত্র হাতে আসবে। নীতিমালা উপেক্ষা করা সরকারি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের ব্যাপারে যথাযথ কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়া হবে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft