দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত আঠারোবাকি ও নড়াইলের চিত্রা নদী পুনখনন হচ্ছে
নড়াইলসহ তিন জেলার লাখো মানুষের মুখে হাসি
এম এম ওমর ফারুক, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি :
Published : Sunday, 13 August, 2017 at 12:31 AM
প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত আঠারোবাকি ও চিত্রা নদী পুনখননে হাসি ফুটেছে নড়াইলসহ তিন জেলার লাখো মানুষের মুখে। দীর্ঘ ৩০ বছর পর প্রাণবন্ত হয়েছে আঠারোবাকি এবং চিত্রা নদীর ৮৬ কিলোমিটার নৌপথ। এছাড়া নদী সংলগ্ন ৩৩টি খালের ৮৯ কিলোমিটার অংশ পুনর্জীবিত হয়েছে। ১৩টি বিলের পানি নিষ্কাশনের মধ্য দিয়ে নিরসন হচ্ছে নড়াইল, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলের ৪৩ হাজার হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা। এদিকে, ৫৭ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ আঠারোবাকি নদীর মধ্যে ৩২ কিলোমিটার অংশে সৃষ্টি করা হয়েছে মিঠাপানির জলাধার। প্রায় ৩০ বছর পর আঠারোবাকি এবং ২০ বছর পর চিত্রা নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই দু’টি নদী পুনঃখননের মধ্য দিয়ে নদী অভ্যন্তরীণ এবং আশেপাশের জীববৈচিত্র্য সজীব হয়ে উঠেছে। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি বিপননসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
বাপাউবো সূত্রে জানা যায়, দুই বছর আগে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার চিত্রা নদীর পুনঃখনন কাজ ২০১৫ সালের জুনে হয়েছে। আঠারোবাকি নদীর সংযোগস্থল খুলনার তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদহ ইউপি কার্যালয় এলাকা থেকে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পাটনা পর্যন্ত চিত্রা নদী পুনঃখনন করা হয়েছে। নদীর দুইপাড়ে সামাজিক বনায়নের আওতায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। পুনঃখননের মাটি দিয়ে নদীর কোল ঘেঁষে প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করে পাঁকাকরণেরও কাজ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চিত্রা ও আঠারোবাকি নদী এবং ৩৩টি খাল তীরবর্তী এলাকার লাখো মানুষ এসব কাজের সফলতা পাচ্ছেন।   
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) নড়াইল ও খুলনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করা হয়। নড়াইলের নড়াগাতি থানার চাপাইলঘাট থেকে খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর ব্রিজ পর্যন্ত ৪২ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং রূপসার নন্দনপুর এলাকা থেকে আলাইপুর ব্রিজ পর্যন্ত সাত কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করা হচ্ছে। স্থান ভেদে প্রায় ১৩ থেকে ২২ ফুট গভীরতায় পুনঃখনন করা হচ্ছে আঠারোবাকি নদী। আর তলদেশের প্রস্থতা সর্বোচ্চ ১৫০ ফুট ও সর্বনি¤œ ৪৫ ফুট এবং উপরি ভাগের প্রস্থতা ৭৫ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ২৮৫ ফুট পর্যন্ত। এদিকে, নদীর বাকি আট কিলোমিটারে নাব্যতা থাকায় পুনঃখনন বা ড্রেজিং করা হচ্ছে না। নদীর মোট দৈর্ঘ্য ৫৭ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার। ইতোমধ্যে আঠারোবাকি নদী পুনঃখননের ও ড্রেজিংয়ের ৫৫ ভাগ কাজ এবং ৩৩টি খাল পুনঃখননের ৮০ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্তে আঠারোবাকি নদীর বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ নির্মাণ এবং নদীর দুই পাড়ে সামাজিক বনায়নসহ রাস্তা তৈরি করা হবে।   
একটি স্লুইসগেট নির্মাণসহ আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন ও ড্রেজিং কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৫ কোটি ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে নদী পুনঃখননে ১১৮ কোটি ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আট ভেল্ট স্লুইসগেট নির্মাণে ৭ কোটি টাকা। ‘খুলনা জেলার ভূতিয়ার বিল এবং বর্ণাল-সলিমপুর-কোলাবাসুখালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন (২য় পর্যায়) প্রকল্প’ এর আওতায় আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন ও ড্রেজিং এবং স্লুইসগেট নির্মাণ চলছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট (বিডিপি) লিমিটেড এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ প্রকল্পের অধীনে আঠারোবাকি নদী পুনঃখননসহ ১০টি কাজ রয়েছে। এই ১০টি কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার টাকা। প্রকল্পটি ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পায়। এর আগে ২০১১ সালের ৫ মার্চ খুলনা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন, আঠারোবাকি নদী পুনঃখননসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও এরই মধ্যে চিত্রা ও আঠারোবাকি নদী এবং খাল পুনঃখননের সুফল পেতে শুরু করেছেন নড়াইল, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার লাখ লাখ মানুষ। বদলে গেছে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পাখিমারা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ ফুলমিয়া বলেন, আঠারোবাকি নদী অনেক ডাঙ্গর (বড়) ছিল। স্টিমার পর্যন্ত চলত। স্বাধীনতার পর নদী আস্তে আস্তে ভরাট হয়ে যায়। এখন নদী কাটায় আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। এতে কৃষি জমির জলাবদ্ধতা দুর হবে। চরবল্লাহাটি গ্রামের নূর ইসলাম খান বলেন, এই নদী মরে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সেই সমতল ভূমি কেটে ‘আঠারোবাকি’ নদীকে যৌবনা করা হচ্ছে। এই নদী পুনঃখননের মধ্য দিয়ে এলাকার জীবনযাত্রা বদলে গেছে। নদীর পানি দিয়ে কৃষকেরা শুষ্ক মওসুমে ধান, পাট, পানের বরজসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করছেন। কালিয়ার পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোল্যা মোকাররম হোসেন বলেন, আঠারোবাকি নদী পুনঃখননে এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন। তবে, পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের বাগুডাঙ্গা বাজার থেকে নদীর উৎসমুখ চাপাইলঘাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার অংশে নদী খনন কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে আগাম বর্ষায় এ এলাকায় জলাবদ্ধতার আশংকা রয়েছে। নদী খননের কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সূত্রে আরো জানা যায়, খুলনার রূপসা নদী থেকে পলিযুক্ত পানি আঠারোবাকি নদী হয়ে চিত্রা নদীর মাধ্যমে ইছামতি খাল দিয়ে তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদহ ইউনিয়নের কোদলার বিলের ৯০ হেক্টর জমিতে এবং একই উপজেলার সাথিয়াদহ ও ছাগলাদহ ইউনিয়নের মসুনদিয়া বিলের ৫২০ হেক্টর জমিতে পলিমাটি প্রবেশ করবে। এ বিল দু’টিতে টিআরএম (নিচু স্থানে পলি জমা করে মাটির স্তর উচু করা) কার্যক্রম পরিচালিত হবে। টিআরএম এর ফলে চিত্রা নদীর পলিবাহিত পানি বিলে ঢুকে পলি পড়ে বিল উঁচু হবে এবং জলাবদ্ধতা দূর হবে। এছাড়া বিলের স্বচ্ছ পানি ভাটার সময় বের হয়ে আঠারোবাকি ও চিত্রা নদীর মাধ্যমে রূপসা নদীতে গিয়ে পড়বে; এতে নদীগুলোর নাব্যতা বজায় থাকবে। এ লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া কালিয়া ও তেরখাদার বিভিন্ন বিলেও পর্যায়ক্রমে টিআরএম পরিচালনা করে বিলসমূহের জলাবদ্ধতা দুর করে চাষাবাদ উপযোগী করে তোলা হবে বলে বাপাউবো সূত্রে জানা গেছে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নবগঙ্গা ও মধুুমতি নদী এলাকায় ৩ দশমিক ১১২ কিলোমিটার স্থায়ী তীর সংরক্ষণ এবং পাটনা, চাপাইল ও ভোগবাগ এলাকায় রেগুলেটরসহ ছয়টি স্লুইসগেট নির্মাণ কাজ। এছাড়া কালিয়া উপজেলাসহ খুলনার তেরখাদা, দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৩টি অভ্যন্তরীণ নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন এবং নয়টি স্লুইসগেট ও রেগুলেটর মেরামত কাজ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে বাপাউবো’র তত্ত্বাবধানে চিত্রা নদী পনুঃখনন, পেরিফেরিয়াল বাঁধ নির্মাণ, কালিয়ার পাটনা, ভোগবাগ ও তেরখাদার লস্করপুর এলাকায় তিনটি স্লুইসগেট নির্মাণ, ৬৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কাজ এবং নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোদলা ও মসুনদিয়া এলাকায় দু’টি বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এই ১০টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার টাকা। প্রকল্পের পুরো কাজ ২০১৮ সালের জুনে শেষ বলে আশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft