দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
বাঁশ দেয়া সেই ভবন পরিত্যক্ত
যমেক হাসপাতালের আলোচিত ওয়ার্ড থেকে সব রোগী সরানো হলো
ফয়সল ইসলাম ও স্বপ্না দেবনাথ :
Published : Wednesday, 9 August, 2017 at 12:16 AM
বাঁশ দেয়া সেই ভবন পরিত্যক্তযশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাদ হেলে পড়া ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ভবনটি রক্ষার্থে বাঁশের ঠেকনো থেরাপিতে ব্যর্থ হয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরাতন ভবনের নিচতলার পুরুষ অর্থো-সর্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীদের গতকালই সরিয়ে নেয়া হয়েছে সার্জারি ও মডেল সার্জারি ওয়ার্ডে। মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীনদের ২৪ ঘন্টার মধ্যে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থিত আবাসিক মেডিকেল অফিসারের বাসভবন মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড স্থাপনের জন্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার একেএম কামরুল ইসলাম বেনু এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।  
সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের পুরাতন ভবনটির নিচতলা (যেখানে অর্থো-সার্জারি বিভাগ পরিচালিত) ১৯৪০ সালে নির্মিত। ঠিক তারই উপরে দ্বিতীয় তলা (মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড) নির্মিত ১৯৭০ সালে। হাসপাতালের সকল ভবনের রক্ষাণাবেক্ষণের কাজে দায়িত্বে রয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। সঠিকভাবে ও নিয়ম মেনে রক্ষাণাবেক্ষণ না করায় দিনে দিনে ভবনটি ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। তারপরও চরম ঝুঁকি নিয়ে সেখানে রোগী সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বহু বছর যাবৎ দ্বিতীয়তলাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিলো। সেখানে পুরাতন ও অকেজো চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুদ করা হতো। রোগীর চাপ সামাল দিতে ২০১০ সালের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে পুরাতন ভবনের দ্বিতীয়তলা যেনতেনভাবে সংস্কার করে গণপূর্ত বিভাগ। ওই জায়গায় স্থাপন করা হয় মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড। ১৪টি শয্যা স্থাপন করা হলেও ৬০/৭০ জন রোগী নিয়মিত ওই ওয়ার্ডে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। প্রায়শ’ ভবনের পলেস্তারা ধসে পড়ে রোগী ও স্বজনদের গায়ে পড়ার একাধিক খবর বাঁশ দেয়া সেই ভবন পরিত্যক্তপাওয়া গেছে। নিচতলার অর্থো-সর্জাারি ওয়ার্ডের অবস্থাও নাজুক। কয়েক মাস আগে সেবাকর্মীরা খেয়াল করেন ভবনটির পূর্ব পাশে নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় ভীম ও পিলারে বড় ধরণের ফাটল দেখা দিয়েছে। একই সাথে ছাদ হেলে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কোন পরিকল্পনা তারা করতে পারেননি। এতে ক্রমেই হেলে পড়তে থাকে পুরাতন ভবনের দ্বিতীয়তলার ভবনের ছাদ। রোগী, স্বজন ও সেবাকর্মীদের নিরপাত্তার কথা চিন্তা করে ৩০ জুলাই গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে পত্র পাঠান হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক। সরেজমিন পরিদর্শন করে ভবনটি রক্ষার জন্যে বাঁশের ঠেকনো থেরাপির উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত বিভাগ। হেলে পড়া ছাদ বাঁশের ঠেকনো দিয়ে রক্ষার লোক দেখানো চেষ্টা করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই রোগী সেবার কাজ চালানোর পরামর্শ দেয়া হয় গণপূর্ত বিভাগ থেকে। কিন্তু সাধারণ মানুষের তাতে আতংক কাটে না। জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন রোগী ও বাঁশ দেয়া সেই ভবন পরিত্যক্তসেবাকর্মীরা। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে রোগী সেবা কার্যক্রম পরিচালনা ও বাঁশের ঠেকনো দিয়ে ভবন রক্ষার চেষ্টার সচিত্র প্রতিবেদন গ্রামের কাগজসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগসহ সরকারের উর্ধ্বতন মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি যত দ্রুত সম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনা ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করার নির্দেশনা আসে যশোর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসাধীনদের খোঁজ নিতে গেলে, যশোর সদরের মোবারক কাঠি কাজীপুর গ্রামের ইমাদুল ইসলাম জানান, ৫ দিন হল তিনি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পা ভেঙ্গে গেছে। এর মাঝে শুনছেন যেখানে সর্বক্ষণ তার স্ত্রী ও ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে থাকছেন সেই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন তার ভয় ভাঙ্গা পা ঠিক করতে এসে শেষে আবার বড় কোন দুর্ঘটনার কবলে না পড়তে হয়।  
সদরের হাটবিলা এলাকার জাহিদ হাসান নামে এক রোগীর স্বজন জানান, বাঁশ দিয়ে ভবনের ছাদ ঠেকনো দেয়া থেকেই শঙ্কার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। একে রোগীর চিন্তা, তার সাথে বাড়তি যোগ হয়েছে একটি ভয় কখন জানি কি হয়?
শরিফা খাতুন নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, তাদের দিন কাটছে চরম শংকায়। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে শেষে সর্বোচ্চ মূল্যের জীবন না দিয়ে যেতে হয় এ চিন্তায় রয়েছেন তারা। বারবার রানা প্লাজার ঘটনা মনে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চৌগাছার মুসলিমা আক্তার বলেন, তার বোন ভর্তি আছেন সপ্তাহ খানেক হল। এর মাঝে তাকে দেখতে অনেকেই আসতে চেয়েছেন তবে ভবনের অবস্থা চিন্তা করে তিনি তাদের নিষেধ করেছেন। কেননা অনেক রোগীই এ বিষয়ে বুঝতে না পারলেও তারা বুঝছেন ছাদ দেবে গেছে। তাই স্বজনদের ভীড় বাড়িয়ে তারা জীবনের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।    
এদিকে, গতকাল খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক রওশন আনোয়ার হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিদর্শনসহ তিনি বৈঠক করেন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার একেএম কামরুল ইসলাম বেনুসহ সিনিয়র ডাক্তারদের সাথে। এরই মধ্যে গতকালই  যশোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফ্র্যান্সিস আশীষ ডি কস্তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র পাঠান ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি যেন কোনভাবেই ব্যবহার না করা হয়।
ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪০ ও ১৯৭০ সালে নির্মিত ভবনের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা বীম, পিলার ও ড্রপ ওয়ালে ফাটল ধরেছে। এতে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ও আপাতত ব্যবহারের অনুপোযোগী। ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ টিম প্রেরণের অনুরোধ করা হয়েছে। একই সাথে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে যতদ্রুত সম্ভব ভবনটি সংস্কারের। ডিজাইন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা ভবনটি পরিদর্শনের পর যদি স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে পুনরায় ব্যবহারের অনুমতি দেন তবে তা বরাদ্দ সাপেক্ষে ভবনটি সংস্কার করা হবে।
এদিকে, খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাক্তার রওশন আনোয়ারের সাথে হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার একেএম কামরুল ইসলাম বেনুসহ সিনিয়র ডাক্তারদের সাথে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সাথে অর্থো-সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীদের পুরুষ সার্জারি ও মডেল সার্জারি ওয়ার্ডে শিফট করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি পুরোপুরি ফাঁকা করে দেয়া হয়েছে। একই সাথে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগীদের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সরিয়ে নেয়া হবে। আবাসিক মেডিকেল অফিসারের বাসভবনের ৪টি কক্ষ ও ২টি বারান্দায় শয্যা স্থাপন করে মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ড পরিচালনা করা হবে। সেখানে শতাধিক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার একেএম কামরুল ইসলাম বেনু গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেই যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন তবে তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। তাও যদি হয় চিকিৎসার স্থানে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কোনভাবেই রোগীদের রেখে সেবা দেয়া সম্ভব নয়। গণপূর্ত বিভাগের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তাদের সাথে আলোচনা করে আপাতত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে রোগীদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নতুন স্থানে নতুনভাবে তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিন পরিদর্শন করে লিখিত মতামত দেয়ার পরই ভবনটি রোগী সেবার কাজে ব্যবহার হবে কিনা সিদ্ধান্ত হবে। যদি ভবন পরিত্যক্ত হয় তবে বিকল্প ব্যবস্থায় রোগী ভর্তি রাখার ব্যবস্থা করা হবে। আর যদি সংস্কার করে ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী করার মতামত পাওয়া যায় তবে তাও হবে যতদ্রুত সম্ভব।




আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft