দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরের ভাতুড়িয়া স্কুল এন্ড কলেজে রাতের আঁধারে ছাদ ঢালাই !
৩ কোটি টাকার নির্মাণ কাজে অস্বচ্ছতা
দেওয়ান মোর্শেদ আলম :
Published : Friday, 19 May, 2017 at 12:21 AM
৩ কোটি টাকার নির্মাণ কাজে অস্বচ্ছতা যশোর শহরতলীর ভাতুড়িয়া স্কুল এন্ড কলেজের একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজে প্রায় ৩ কোটি টাকার অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। রাতের আঁধারে এখানে চলেছে ছাদ ঢালাই। কথিত নির্মাণ কমিটি বানিয়ে কলেজের সভাপতিকে না জানিয়েই করা হয়েছে পাইলিং ও ঢালাই। নির্মাণে সিডিউল মানা হচ্ছে না, এমনকি নির্মাণ সামগ্রীর অনুপাত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকার লোকজন। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে ছাদ ঢালাইয়ের পর একই ছাদে দু’ইঞ্চি উঁচু নিচু পরিলক্ষিত হয়। আর এই বিশাল অসংগতির ঘাপলা পুটিং দিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভাতুড়িয়া এলাকায় তুমুল হৈচৈ শুরু হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভের। ভবন নির্মাণ অর্থ বরাদ্দে এমপি কাজী নাবিল আহমেদের বিশেষ ভূমিকা থাকায় অস্বচছ নির্মাণ প্রক্রিয়ায় তার ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ভাতুড়িয়া স্কুল এন্ড কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ সরকারের উপর মহলে কথা বলে ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করিয়ে দেন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নে একাডেমিক ভবন নির্মাণে টেন্ডার করা হয়। যশোরের মঈনুদ্দিন আহমেদ বাঁশি নামে এক ঠিকাদার এই কাজটি পান। তথ্য মিলেছে শুরুতে ঘাপলা দিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি সেলিম রেজা পান্নুকে না জানিয়ে কথিত একটি নির্মাণ কমিটি করে কাজ এগুতে থাকে। নির্মাণ কমিটিতে ওই এলাকার আতিয়ার রহমান নামে একজনকে রাখা হলেও তা কেবল খাতা কলমে। নির্মাণ স্থলে স্থানীয়রা তাকে দেখেননি। এছাড়া সদস্য সচিব প্রতিষ্ঠান অধ্যক্ষ আরিফুজ্জামানও নির্মাণ কাজটি ঠিকমত দেখভাল করছেন না বলেও অভিযোগ। একেতো কথিত নির্মাণ কমিটি ও তাতে আবার তাদের অনুপস্থিতির কারণে শুধু মাত্র ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে নির্মাণ কাজ চলছে।
অভিযোগ এসেছে এই নির্মাণে বরাদ্দের একটি বিশাল অংশ পাইলিংয়ে খরচ হয়েছে অথচ প্রতিষ্ঠানের সভাপতি তা জানেন না। তাকে না জানিয়ে পাইলিং থেকে শুরু করে ছাদ ঢালাই পর্যন্ত হয়েছে। যে পাইলিং মাটির নিচে এবং এখন তা অদৃশ্য। ৪ মে ভবনের প্রথম তলা ঢালাই হয়েছে রাতের আঁধারে। যদিও দিনের আলোয় কাজ শেষ করার কথা নীতিমালায় রয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষকে নকশা পর্যন্ত দেয়া হয়নি। বহুবার দেনদরবার করে একটি কাটা ছেঁড়া সিডিউল হাতে পেয়েছেন তারা। ৩ কোটি টাকার নির্মাণ কাজে অস্বচ্ছতা
সিডিউল আমলে না নিয়ে উল্লেখিত অনুপাত না মেনে সামগ্রী ব্যবহার করতে  নানা লুকোচুরির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কয়েক জনের অভিযোগ। সিডিউল অনুযায়ী ঢালাইয়ে এক ব্যাগে সিমেন্টের সাথে এক ব্যাগ সিলেট বালি, আধা ব্যাগ কুষ্টিয়ার ভাল বালি ও এক ব্যাগ এক নম্বর পিকেট খোয়া দিতে হবে। কিন্তু আভিযোগ রয়েছে এখানে সিমেন্ট বালি খোয়ার অনুপাত না মেনে ঘাপলা করে শুভংকরের ফাঁকি দেয়া হয়েছে। আর ঢালাই চলেছে রাত ১০টা অবধি। আর ঢালাইয়ের পর ছাদের কোথায় আড়াই ইঞ্চি আবার কোথায় দুই ইঞ্চি উঁচু নিচুর বিশাল অসংগতি। এক পাশের ছাদ দেবে যাওয়ার খবরে এলাকায় হৈচৈ পড়ে যায়, ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এই বিশাল অসংগতি ঢাকতে ৪ দিন পর সেখানে পুটিং দেয়া হয়েছে।
ভাতুড়িয়া এলাবাবাসী বলছেন এই বিদ্যাপিঠের একাডেমিক ভবনটির সুফল এ এলাকারই ছাত্র/ছাত্রীরা ভোগ করবে। অথচ এখানে মোটা অংকের বরাদ্দ আসলেও তার সিংহভাগ পকেটস্থ করে যেনোতেনো ভাবে নির্মাণ কাজ উঠিয়ে নেয়ার অপতৎপরতা চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বিপ্লবকে এসাইন করা হলেও তিনি সেখানে অধিকাংশ সময়ই থাকছেন অনুপস্থিত। ঠিকাদারকে সুবিধা দিয়ে নিজে সুবিধা নেয়ার হীন মানসে এই সহকারি প্রকৌশলী সব কিছু ঠিকঠাক চলছে বলে অফিসে বসেই সাফাই গাইছেন। ছাদ ঢালাইয়ের দিন তাকে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভাতুড়িয়া কলেজ কর্তৃপক্ষ বনমালি নামে একজন প্রাইভেট প্রকৌশলী সম্মানির ভিত্তিতে নিয়োগ দিলেও তিনি ওই সহকারি প্রকৌশলীর সুরে কথা বলছেন। তার চোখেও কোন অসংগতি ধরা পড়ছে না।
এব্যাপারে কথা হয় প্রতিষ্ঠানের সভাপতি সেলিম রেজার পান্নুর সাথে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হলেও এই নির্মাণ সংক্রান্তে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। পাইলিং থেকে প্রথম তলার ছাদ ঢালাই হয়ে গেলেও তাকে ডাকা হয়নি। শুনেছেন রাতের আঁধারে ঢালাই হয়েছে। আর পাইলিংয়ের নামে অর্ধ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলেও শুনেছেন। কিন্তু সেখানে নির্মাণ কমিটি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কারো অংশগ্রহণ নেই। তার হাতে ডিজাইন পর্যন্ত নেই। এই তিন কোটি টাকার কাজ চলছে খেয়াল খুশিমত। যথেচ্ছা করছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বিপ্লব, ঠিকাদারসহ আরও কয়েকজন। যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের বিশেষ ভূমিকা ছিল বরাদ্দ আনতে। কিন্তু নির্মাণ ঘাপলার কারণে তার ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।  এব্যাপারে কলেজ অধ্যক্ষ ও নির্মাণ কমিটির সদস্য সচিব আরিফুজ্জামানের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
তিনি জানান, আসলে নির্মাণ কাজে ত্রুটি হচ্ছে, কি হচ্ছে না তিনি বলতে পারবেন না। তবে ছাদ ঢালাইয়ের পর এক অংশ দেবে যায় সত্য। উঁচু নিচুও চোখে পড়ে। যা পরে পুটিং দিয়েছে মিস্ত্রিরা। কলেজ থেকে বনমালি নামে একজন প্রকৌশলী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করছেন। সভাপতিকে বাদ দিয়ে নির্মাণ কমিটি হল কিভাবে এ প্রশ্নে আরিফুজ্জামান জানান, আতিয়ার রহমান এলাকার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি তাই তাকে বানানো হয়েছে। আর সভাপতি সেলিম রেজার পান্নুর বিষয়টি এড়িয়ে যান অধ্যক্ষ।
কথা হয় সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বিপ্লবের সাথে। তিনি জানান, পাইলিং, ছাদ ঢালাই সবঠিকই আছে। ছাদ উঁচু নিচু হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন ক্রেন বসিয়ে খোয়া উঠানোর কারণে ছাদ এক পাশ দেবে যায় পরে পুটিং দিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে। এখন আর কোন কোন ঝুঁকি নেই। পাইলিং অংশে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও জানান তিনি। রাতের আঁধারে ঢালাই হয়েছে, আর তিনি উপস্থিত ছিলেন না এটা সত্য নয় দাবি করে বলেন দিনের আলোয় কাজ শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে আরও কথা হয় কলেজ নিযুক্ত প্রকৌশলী বনমালির সাথে। তিনি জানান, ছাদ ঢালাইয়ে একটু সমস্যা হয়েছিল ঠিক। কিন্তু পুটিং করে ঝুঁকিমুক্ত করা হয়েছে। পাইলিংয়ে ঘাপলা হয়েছে কিনা তিনি বলতে পারবেন না, কেননা পালিংয়ের পরে তিনি নিযুক্ত হন।
এদিকে সরেজমিনে ভাতুড়িয়া নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করে আসার পর সহকারি প্রকৌশলী পরবর্তী ঢালাই কাজ স্থগিত করেছেন বলে তথ্য এসেছে। ওই সরকারি ঠিকাদার রড সিমেন্ট বালি পরীক্ষা করবেন বলে মিস্ত্রীদের নিয়ে বলে এসেছেন। এদিকে ১৭ মে ভাতুড়িয়া স্কুল এন্ড কলেজ থেকে আসার পথে রাস্তায় এলাকার কয়েকজন এ প্রতিবেদকের মোটরসাইকেল গতিরোধ করেন।
তারা জানান, এখানে যে অনিয়ম হচ্ছে তার সাথে কলেজ অধ্যক্ষ, ঠিকাদার, সহকারি প্রকৌশলী জড়িত। আর পরে নিযুক্ত হওয়া প্রকৌশলী বনমালিকে আয়ত্বে এনেছেন ঠিকাদার ও সহকারি প্রকৌশলী। এখনই এ নির্মাণ কাজ যথাযথ দেখভাল করা না হলে তিন কোটি টাকার সিংহভাগ হজমের খাতায় চলে যেতে পারে। তারা দ্রুত এব্যাপারে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপর মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft