দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
ঝালভাত খাওয়া চৌগাছার সেই শিশু লিজার বয়স এখন ৬
দুধের বন্দোবস্ত হলেও আগামীর জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন
শাহানুর আলম উজ্জল/খলিলুর রহমান জুয়েল, চৌগাছা (যশোর) থেকে :
Published : Sunday, 19 February, 2017 at 12:47 AM
দুধের বন্দোবস্ত হলেও আগামীর জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন যশোরের চৌগাছায় সেই ভাগ্যাহত লিজার বয়স এখন ৬ বছর। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে সে এখন একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের কেজি শ্রেণির ছাত্রী। যে বয়সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুষ্টিকর খাবার মায়ের বুকের দুধ খেয়ে স্নেহ-আদরে বেড়ে ওঠার কথা; সেই বয়সে তাকে খেতে হয়েছে শুধু ঝাল-ভাত। চৌগাছার তারানিবাস গ্রামে এ শিশুকে নিয়ে ২০১০ সালে দৈনিক গ্রামের কাগজে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন লিজার বয়স ছিল মাত্র ১ বছর। খবর প্রকাশের পর দুধপানের জন্য কিছু অর্থের সহযোগিতা করেন যশোরের এক ডাক্তার। খবরটি সে সময় ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি করে।
ফিরে দেখা ঃ উপজেলার তারানিবাস গ্রামের মৃত নূরুল ইসলামের ছেলে জিয়াউর রহমান চার বছর আগে যশোর সদরের শ্যামনগর গ্রামের ঘরজামাই জাফর ইকবলের মেয়ে মলিকে বিয়ে করে। বিয়ের তিন বছর পর তাদের ছোট্ট পরিবারে একটি ফুটফুটে শিশু কন্যার জন্ম হয়। বিয়ের পর থেকেই মলি এলোমেলো চলাফেরা করতে থাকে। সংসারী আর দশজন মেয়ের মত নয়। দরিদ্র হয়েও এক  রনের উচ্চাভিলাসী জীবন-যাপনের স্বপ্ন দেখত মলি। কাউকে না বলে বিভিন্ন স্থানে চলে যেত এবং বিভিন্ন জনের সাথে মোবাইলে সম্পর্ক গড়ে তুলত। লিজার বয়স যখন মাত্র ১৪ দিন সেই অবস্থায় ফেলে সে যশোর শহরের পুরাতন কসবা ঘোষপাড়া এলাকায় থাকত। সেখানে মোবাশ্বের আলীর বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। নানা কারণে শিশু লিজার বাবাও হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত। পিতা মাতার অসহনীয় যন্ত্রণায় শিশুটির বেড়ে ওঠার জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। বিশেষ করে মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুটি তার দাদীর কোলে বেড়ে উঠতে থাকে। স্বামীহারা অসহায় পঞ্চাষোর্ধ বয়সী দাদী তার নিজের খাবারই জোটাতে পারেন না। চেয়ে চিন্তে চলতে হয় তাকে। তাই শিশুর খাবার একমাত্র মায়ের দুধ না থাকায় দাদী যা খায় তাই খায় সে। তরকারীর অভাবে পানতা ভাতে ঝাল পিষে খেলেও শিশুটির অভ্যস্ত হয়ে যায়। পুষ্টিহীনতা আর রোগে-শোকে কাতর হয়ে পড়ে। শিশুটি নিয়মিত ঝালভাত খেয়ে বেড়ে ওঠে। বড়রা ঝালের শিশানীতে কষ্ট পেলেও এ তার কোন কষ্ট নেই। কোন কান্নাকাটি নেই। বরং ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের পর সে সান্ত¡না পায়। না বুঝলেও এক নতুন যুদ্ধ করে সে সময়। শিশুর দাদী কুলসুম বেগম জানান, টাকার অভাবে ওর দুধ দিতে পারি না। কান্নাকাটি করলেই ঝাল পিষে ভাত দিই। তাই খেয়ে বড় হচ্ছে।
২০১০ সালে ৯ আগস্ট কে বা কারা শ্বাসরোধ ও এসিড দিয়ে ঝলসে শিশুটির মাকে হত্যা করে। পুলিশ পরের দিন শহরের ভাড়া বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে। এলাকার লোকজন ধারণা, বেপরোয়া চলাফেরা করার কারণে সে হত্যার শিকার হয়। সে সময় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোরের এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শিশু লিজার দুধ খাওয়ার কিছু অর্থ প্রদান করেন। এরপর সেই অর্থ দিয়ে দুধ ক্রয়ের ব্যবস্থা করলে লিজা ঝাল ভাত খাওয়ার পরিবর্তে দুধ পান শুরু করে। এ বিষয় সে সময় গ্রামের কাগজের খবরে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়।
মর্মস্পর্শী সেই ১ বছরের শিশু লিজার বয়স এখন ৬ বছর। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে অতি কষ্ট করেই দাদী কুলসুম বেগম বুকেপিঠে করে মায়ের মত স্নেহে মানুষ করছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন গেলে লিজার দাদী হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। প্রতিনিধিকে জড়িয়ে মুহূর্তে ফিরে যান অতীতে। তিনি এ সময় বলেন, গ্রামের কাগজে লেখার কারণে মা হারা মেয়েটি দুধ খেয়ে মানুষ হয়। তিনি বলেন খুব কষ্ট করেই লিজাকে মানুষ করছি। কষ্ট করে হলেও আমি চাই সে যেন ভালো স্কুলে পড়তে পারে। একই সাথে মানুষের মত যেন মানুষ হয়। সে কারণে চৌগাছার একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। এখন লিজা নার্সারি থেকে কেজিতে পড়ে। কথা বলার সময় শিশুটি বাড়িতে ছিল না। পাশেই একটি ধর্মীয় সভা মাঠে বেড়াতে গিয়েছিল। সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই দাদী কুলসুম বেগম তাকে ডেকে পাঠান। কিছুক্ষণ পর সে উপস্থিত হয়। এ সময় তার মুখে হাসি লক্ষ্য করা গেছে। দুর্বিষহ সেই জীবনের গল্প লিজার স্মৃতিতে নেই। সে যে বড় মাপের শিশু সংগ্রামী তাও সে জানে না। মনে নেই তার মায়ের কথা। এখন তার ‘দাদীই মা’। কিন্তু শিশু লিজা কি বাস্তবতায় নতুন করে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে পারবে? পারবে লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হতে? এ প্রশ্ন এখন শিশু লিজা ও তার দাদিমার চোখেমুখে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : gramerka@gmail.com, editor@gramerkagoj.com
Design and Developed by i2soft